ইদের পোশাক বেচা-কেনায় খুশি নন ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ

ইদের পোশাকের দাম বাড়লেও
খুশি নন ক্রেতা-বিক্রেতা-শ্রমিকরা

এবার সবেচেয়ে বেশি
অর্ডার পড়ছে ‘আলেয়া’।

মরিয়ম জাহান মুন্নী

ছোট ছোট কক্ষে তিন-চারটা করে সেলাই মেশিন, আট-দশেক মানুষ। যে যার মত পোশাক তৈরির কাজে ব্যস্ত। সেই তৈরি পোশাকই আবার দোকানের তাকে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। বাহারি রঙের জরি, চুমকির কাজ করা পোশাকগুলো দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছেন পাইকারি দামে।  

ইদুল ফিতরকে সামনে রেখে নতুন পোশাক তৈরি ও বিক্রির ধুম লেগেছে নগরীর দর্জিপাড়া খ্যাত ঐতিহ্যবাহী খলিফাপট্টিতে। এখানকার চার শতাধিক কারখানার প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের এখন যেন দম ফেলার ফুরসত নেই।

খলিফাপট্টির ব্যবসায়ীরা বলেন, এবারর ইদে পোশাকের দাম বেশ বেড়েছে। এছাড়া সবেচেয়ে বেশি অর্ডার পড়ছে মেয়েদের ‘আলেয়া কাটিন ড্রেস’। পাশাপাশি তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে গারারা, সারার, ফ্রগ, থ্রিপিস ও লেহেঙ্গা।

খলিফাপট্টির কারখানায় তৈরি পোশাক চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার নামিদামি বিপণি বিতানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। ঝলমলে ইদের রঙ্গিন পোশাক নারী, শিশু ও তরুণীদের চোখে-মুখে হাসি ফোটালেও খুশি নন এখানের ব্যবসায়ী এবং কর্মচারীরা। কারণ এবার পোশাক তৈরির উপকরণের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। চায়না- ভারত থেকে আসা কাপড় দিয়ে তৈরি হয় এ পোশাক। যেসব কাপড়ের দাম আগে গজ ছিল ১০০-৩০০ টাকা। সেগুলো এখন বেড়েছে ৩০০-৬০০ টাকার বেশি। এছাড়া এখন ঢাকা- চট্টগ্রামের যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় এবং সামাজিত যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যবসাপদ্ধতি চালু হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ঢাকার নারায়নগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে পণ্য সংগ্রহ করে। এতে খলিফাপট্টির উপর কমেছে নির্ভরশীলতা। যেকারণে আয় কমেছে এখানের ব্যবসায়ীদের। সারাবছরই ব্যবসা মন্ধা চলে। তবে ইদের আগে কিছুটা জমে উঠে বলেও দাবি তাদের।

খলিফাপট্টির ফাইভ স্টার এমব্রয়ডারী হাউস স্বত্বাধিকারী রাসেল বলেন, আয় বাড়েনি, তবে ব্যয় বেড়েছে। দিন দিন ব্যবসার পরিধি ছোট করতে হচ্ছে। ইদকে কেন্দ্র করে ব্যবসা এখন জমজমাট হলেও লাভ সীমিত। শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, পোশাক সেলাইয়ের দাম বেড়েছে। এখন আর আগের সেই ব্যবসার অবস্থা নেই চট্টগ্রামের খলিফাপট্টিতে। তাই এবার ইদের তৈরি পোশাক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

তবে দূরদূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ক্রেতারা বলছেন লাগাম ছাড়া দাম বেড়েছে রেডিমেট পোশাকের। একশ’ পিস পোশাকে দাম বেড়েছে ৩-৫ হাজার টাকা। যা রীতিমত কপালে চোখ উঠার মত অবস্থা বলেন তারা।

সাতকানিয়া থেকে ইদের পোশাক নিতে আসেন ব্যবসায়ী মিলন। অভিযোগ করে তিনি বলেন, এবার অনেক বেশি দাম বেড়েছে রেডিমেট পোশাকগুলোর। আগে ১০০ পিস বাচ্চাদের পোশাক পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় কিনতে হতো। এখন সেগুলো দাম বেড়ে হয়েছে ১০-১২ হাজার টাকা। তাই পণ্যও কম নিচ্ছি। কারণ এতো দামে যদি বেচা না হয় তাহলে বিক্রি না হওয়ার আশংক্ষা আছে।

তবে এখানের ব্যবসায়ী কামাল, ওমর ফারুক বলেন, দিন দিন কমছে ব্যবসার পরিধি। আগের সেই বেচাবিক্রি নেই। যারা আগে হাজারের উপর পোশাক কিনতেন তারা এখন নেন কয়েক’শ পিস মাত্র। এদিকে শ্রমিকসহ সব কিছুরই বেড়েছে দাম। এদিকে, শুধু মালিক পক্ষই নয়, বেতন বাড়লেও অসন্তুষ্ট শ্রমিকরা।

সৈকত ফ্যাশন, ভাই ভাই ফ্যাশনের কর্মী বলেন, বিপণি বিতানগুলো ঝলমলে পোশাকের ‘গলাকাটা’ দাম নেওয়া হলেও সেগুলো বানানোর জন্য তারা নামমাত্র মজুরি পান। কারণ এখানে আলাদাভাবে কাটিং মাস্টার, ডিজাইনার না থাকা এবং সস্তা শ্রমের কারণেই মূলত এখানে কম টাকায় পোশাক তৈরি করা হয়। যারা শ্রমিক তারা সব সময়ই আর্থিতভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। যে কারনে এখন আর কেউ সেলাই কাজ শিখতে আসে না।

তারা আরো বলেন, যে কোনো ডিজাইন একবার দেখলেই আমরা অবিকল পোশাক তৈরি করতে পারি। নিজেরাই ডিজাইনার, নিজেরাই কারিগর। এতো কাজ জানা শর্তেও অভাব ছাড়ে না। চল্লিশ বছর ধরে কাজ করছেন এমন কারিগর আছেন। পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি রয়েছে নারী এবং শিশু শ্রমিকও। জানা যায় অল্প টাকায় কাজ করেন নারী ও শিশু শ্রমিকরা।

শ্রমিক শাহজাহান, মিলন, মিণ্টন, কুসুম, হাজেরা বলেন, আগে মাসে পাঁচ-সাত হাজার টাকা বেতনে কাজ করতো এখন নয় থেকে ১২ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন তারা। তবে ইদে বাড়তি কাজের জন্য কোনো ওভারটাইম দেয় না তাদের। ইদের সময় মালিকদের ইচ্ছে হলে পাঁচ-ছয়শ টাকা বোনাস দেয়। নইলে দেয় না। এইভাবে বছরের পর বছর কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি খন্দকার নুরুল ইসলাম বলেন, ইদ ছাড়া অন্য সময়গুলোতে ব্যবসা নেই। ইদকে কেন্দ্র করে
কিছুটা জমে উঠেছে। দিন দিন কমছে ব্যবসায়ী এবং শ্রমিক। ২০০৫ সালে এখানে ছয় হাজার ব্যবসায়ী ২০ হাজারের বেশি কর্মী ছিল এখন এটি এসে দাঁড়ায় চারশ’ ব্যবসায়ীর পাঁচ হাজার শ্রমিকে। এর কারণ বিভিন্ন কারখানা ভেঙে বহুতল ভবন তৈরি করে ব্যবসায়ীদেরকে আর দোকান দেয়া হচ্ছে না। তাদের ছাড়তে হচ্ছে খলিফাপট্টি। এসব কারণে এখন পোশাকের দাম বেশি। দাম বেশি হলেও টিকে থাকা যাচ্ছে না।

খলিফাপট্টির পোশাক কারখানায় তৈরি হয় রুচিশীল পোশাক রেডিমেট পোশাক। যেগুলো নূন্যতম ৩০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ দশ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তৈরি পোশাকের মধ্যে রয়েছে বাচ্চাদের স্যুট, শার্ট, প্যান্ট, মেয়েদের ফ্রক, থ্রিপিচ, লেহেঙ্গা ও স্কার্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *