মরিয়ম জাহান মুন্নী
দেশীয় নামী- দামি ব্রান্ডের পোশাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঈদ বাজারে চট্টগ্রামের ডিজাইনারদের তৈরি পোশাকের বিকিকিনি চলছে বেশ ভালই। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দাবি- ডিজাইন, কাপড় ও কারুকাজের দিক থেকে কোন অংশেই কম নয় চট্টগ্রামের বুটিক হাউসগুলোর পোশাক। দামও সব শ্রেণীর ক্রেতার নাগালে। তাই বিক্রির দিক থেকেও পিছিয়ে নেই স্থানীয় ফ্যাশন হাউসগুলো। পুরোদমে বিকিকিনি চললে বেশ ভাল ব্যবসা প্রত্যাশা করছেন তারা।

সরেজমিন ঘুরে চট্টগ্রামের বুটিক হাউসগুলো দেখা যায়, কটন, সফুরা সিল্ক, মসলিন, জামদানি, খাদি ও তাঁতের কিছু নির্দিষ্ট উপকরণ দিয়ে মূলত পোশাকগুলো তৈরি করা হয়েছে। এসব কাপড়ের মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে শাড়ি, থ্রি-পিচ, টু-পিচ, কুর্তি, কুটি ও গাউন। আবার তৈরি হচ্ছে ছেলেদের ফতুয়া, পাঞ্জাবি ও শার্ট। রয়েছে শিশুদের আরামদায়ক পোশাকও।
চট্টগ্রামের খ্যাতনামা ডিজাইনিং হাউস ‘শৈল্পিক’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এইচ এম ইলিয়াস বলেন, দেশীয় পোশাকের মান অবশ্যই ভালো হয়েছে। তবে শুধু আমাদের দেশীয় উপকরণ দিয়ে পোশাক তৈরি ও ডিজাইন করা হলে সেগুলোতে ক্রেতাদের খুুব একটা আগ্রহ থাকে না। কিন্তু দেশীয় কাপড়ের সাথে বিদেশি কাপড় মিলিয়ে পোশাক তৈরি করলে সেটাতে ক্রেতার আগ্রহ বেশি থাকে। কারণ ক্রেতারা এখন পশ্চিমা পোশাকের সঙ্গে দেশীয় পোশাকের মেলবন্ধন দেখতে চায়। ক্রেতাদের রুচির কথা চিন্তা করে বাজারে পোশাক আনতে হচ্ছে। চট্টগ্রামের যেসব ফ্যাশন হাউস এই দুইয়ের সমন্বয়ে পোশাক তৈরিতে সিদ্ধহস্ত তাদের ব্যবসা ভালই যাচ্ছে।
মিমি সুপার মার্কেটের ‘সাইমাস ক্রিয়েশন’এর কর্ণধার ও ডিজাইনার সাইমা সুলতানা বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আমাদের স্থানীয় ডিজাইনারদের তৈরি পোশাক এখন আন্তর্জাতিক মানের পোশাকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আবার আমরা চট্টগ্রামে যারা আছি তাদের মধ্যে অনেকে চট্টগ্রাম থেকে দেশব্যাপী কাজ করছি। প্রতিবছর ঈদসহ বিভিন্ন বাঙালি উৎসবে আমাদের দেশীয় ডিজাইনাররা অসাধারণ কিছু ডিজাইন নিয়ে আসেন। এগুলোর চাহিদাও বেশি।
খুলশী কনকর্ড টাওয়ারের ‘স্ট্রাইপ ফ্যাশন হাউস’এর কর্ণধার সাদমান সাঈকা সেফা বলেন, দেশীয় বুটিক আরো ভালো করতো, যদি বিরাজমান কিছু সমস্যার সমাধান করা যেত। এরমধ্যে বড় সমস্যা হচ্ছে, পোশাক তৈরির কাঁচামালের দাম অনেক বেশি। তার উপর আমাদের কিছু লিমিটেড উপকরণ নিয়ে কাজ করতে হয়। অথচ ভারত-পাকিস্তানে তারা অনেকগুলো উপকরণের মিশ্রণে কাজ করে। তাদের এ কাপড়গুলোর চাহিদা আমাদের দেশে বেশি। আবার দামেও সস্তা। আমরা কাজ করি মূলত সফুরা সিল্ক, মসলিন, জামদানি, খাদি, কটন, তাঁত এমন কিছু নির্দিষ্ট উপকরণ নিয়ে। কিন্তু এগুলো এখন অনেক দামে বিক্রি হচ্ছে। এত দামের মধ্যেও যখন কোনো প্রোডাক্ট তৈরি করি, দেখা যায় বিক্রির সময় ক্রেতার সাথে দামের তারতম্য হয়। পাশাপাশি দক্ষ কারিগরের অভাব রয়েছে। আবার আমরা যারা নারী উদ্যোক্তা আছি ব্যাংক থেকে লোন নিতে গেলে তারা ঋণ দিতে চায় না। বাবা বা স্বামীর বিভিন্ন রকম কাগজপত্র খোঁজে। আলাপকালে অন্যসব ডিজাইনার- উদ্যোক্তারা এসব সমস্যার কথাই জানালেন।

চট্টগ্রামের ফ্যাশন ডিজাইনার ‘রওশন বুটিক হাউসের কর্ণধার রওশন আরা চৌধুরী বলেন, নব্বইয়ের দশকে আমরা যখন দেশীয় পোশাক নিয়ে কাজ করছিলাম তখন সারাদেশে হাতেগোনা কয়েকজন দেশীয় বুটিস নিয়ে কাজ করতো। সে সময়ে ভালোই চলছিল দেশীয় কাপড়ের তৈরি পোশাকগুলো। কিন্তু একসময় আমরা পাকিস্তানি-ভারতীয় ডিজাইনারদের তৈরি পোশাকের সাথে টেক্কা দিতে পারছিলাম না। এমন কিছু সমস্যার কারণে পুরোনো ডিজাইনাররা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। এভাবে প্রায় এক যুগের বেশি সময় জৌলুস হারায় দেশীয় বুটিক। তবে এখন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রামের দেশীয় বুটিকগুলো।
চট্টগ্রামের পুরোনো বুটিক হাউস ‘অনিন্দ্র’এর কর্ণধার লুৎফা সানজিদা বলেন, ১৯৮৯ সালের দিকে যখন আমরা কাজ করতাম তখন দেশীয় পোশাকের ভালো মার্কেট ছিল। পরে ভারত-পাকিস্তানের কাপড়গুলোর চাহিদা তৈরি হয়। তখন আমরা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ি। কারণ তখন বিভিন্ন কাপড়ের গজ প্রতি ১০০-১৫০ টাকা দাম বেড়ে যায়। এ দামে পোশাক তৈরি করে বিক্রি করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। তাই একটু মার খাই। তবে এখন আশার আলো দেখছি। এখনকার ছেলেমেয়েরা ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের উপর পড়াশোনা করে তারপর ব্যবসায় আসছে। তাই তারা ভালোও করছে। বিদেশি ডিজাইনারদের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।