নবযাত্রা ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও তার আশপাশের এলাকায় আঘাত হেনেছে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প। বুধবার রাতে মাত্র উনচল্লিশ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার এই দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার ফলে ধসে পড়েছে বহু বহুতল ভবন। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।
প্রথম ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে মোরন নামক এলাকার কাছে, যার গভীরতা ছিল ২১.৯ কিলোমিটার। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এই ঘটনাকে প্রাক-কম্পন এবং মূল কম্পনের একটি জোড়া রূপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রথম কম্পনের ঠিক উনচল্লিশ সেকেন্ড পর আঘাত হানা ৭.৫ মাত্রার মূল ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার। এর পর অন্তত ২০টিরও বেশি অনুকম্পন (আফটারশক) রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
ডেলসি রদ্রিগেজ বা সরকারি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাণহানির সংখ্যা প্রকাশ করা না হলেও, ইউএসজিএস-এর প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্বাভাস মডেল পেজার অনুযায়ী এই বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে এক লাখের ঘরে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। রাজধানী কারাকাসের চ্যাকাও মিউনিসিপ্যালিটির মেয়র গুস্তাভো দুকে জানিয়েছেন, সেখানে বেশ কিছু ভবন ধসে পড়েছে এবং একটি ভবন থেকেই ১৮ জন জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। ফ্যালকন রাজ্যের গভর্নর ভিক্টর ক্লার্ক জানিয়েছেন, সেখানে অন্তত বত্রিশ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং ভবনের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এই বিপর্যয়ের কারণে ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমানবন্দরের টার্মিনালের ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ায় সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া দেশের সব শিক্ষানুষ্ঠান আগামী কয়েক দিনের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেশের সমস্ত স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের আহতদের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দেয়া জন্য অনতিবিলম্বে হাসপাতালে হাজির হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই কঠিন সময়ে ভেনেজুয়েলার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জরুরি সহায়তা পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের ডেপুটি সেক্রেটারি ক্রিস্টোফার ল্যান্ডউ এক বার্তায় ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি সমবেদনা ও পাশে থাকার আশ্বাস ব্যক্ত করেছেন। ভূমিকম্পের সময় কারাকাসের একটি শপিং সেন্টারের শীর্ষ তলাতে থাকা ব্যবসায়ী হেইডি রোমেরো সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, এটি বিশ্বাস করার মতো ছিল না, কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল তা আমি নিজেও জানি না।
আমাদের জরুরি সিঁড়ি দিয়ে বাইরে বের করে আনা হয়েছিল। কারাকাসের বাসিন্দা রবার্তো গামাস ভবন থেকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময়কার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ভবনটি আক্ষরিক অর্থেই এপাশ-ওপাশ দুলছিল। অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি, কম্পনের তীব্রতা ছিল প্রচণ্ড। আমরা যখন হাঁটছিলাম, তখন আমাদের চারপাশ ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। অ্যাপার্টমেন্টের সবকিছু নিচে পড়ে যায়। ভাগ্য ভালো যে আমরা শেষ পর্যন্ত বের হতে পেরেছিলাম। পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্টিনেজ জানান, তিনি হঠাৎ বিকট একটি শব্দ শুনতে পান এবং ঘরের জিনিসপত্র ভেঙে পড়তে দেখেন। তিনি বলেন, একটি প্রচণ্ড জোরে ভেঙে পড়ার শব্দ হলো। ঘরের সব জিনিসপত্র এবং ফ্রিজের ভেতরের পাত্রগুলো পড়ে গেল। আমি আমার জীবনে কখনো এমন কিছুর মুখোমুখি হইনি।
দক্ষিণ কারাকাসের ৮০ বছর বয়সী পেনশনভোগী মারিয়া রোমেরো পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় নিজের ঘর থেকে বের হতে পেরেছিলেন। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই ভূমিকম্পটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ, এমনকি ১৯৬৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের চেয়েও এটি বেশি বিপজ্জনক ছিল। অন্য একজন ৪১ বছর বয়সী নারী জানান, কম্পন তীব্র হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি তার মুঠোফোনে একটি সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি যখন ফোনটি হাতে নিয়ে বার্তাটি শোনার চেষ্টা করছিলাম, তখনই প্রথমে হালকা কম্পন অনুভব করলাম।
তারপর দুই সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে সবকিছু প্রচণ্ড জোরে দুলতে শুরু করল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, টার্মিনাল ভবনটি কাঁপার সময় এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে ধুলোর মেঘ তৈরি হওয়ার সাথে সাথে যাত্রীরা তাদের মালপত্র হাতে নিয়ে আতঙ্কে ভবনের বাইরে ছুটে যাচ্ছেন। অনেকে আবার জীবন বাঁচাতে বিমানবন্দরের ভেতরের একটি খাবারের কাউন্টারের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন। অপর একটি দৃশ্যে দেখা গেছে, এক ব্যক্তি নিজের জীবনের পাশাপাশি তার দুটি পোষা কুকুরকে কোলে তুলে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে বেরিয়ে আসছেন। তীব্র কম্পনের কারণে পাহাড়ে ভূমিধসের ঘটনাও ঘটেছে।