চট্টগ্রামে আট মাসে শিক্ষার্থীসহ ৫১ জন
আত্মহত্যা করে। এরমধ্যে ৩৪ জন নারী,
১৭ জন পুরুষ।
আগস্টে চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীসহ
১০ আত্মহত্যা করেছে।
মরিয়ম জাহান মুন্নী
এইচএসসি পরীক্ষার্থী রিমঝিম দাশগুপ্ত (২০) শুধুমাত্র প্রবেশপত্র হারিয়ে ফেলার কারণে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। এ মর্মান্তিক ঘটনাটি আগস্ট মাসের ২৬ তারিখ নগরীর সদরঘাট এলাকায় ঘটেছে। ১০ তারিখ বোনের বাসায় প্রেমঘটিত কারণে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে আশরাফ হোসেন জোবাইর (২৪) নামে এক কলেজছাত্র।একই মাসে খুলশীতে পোষা পাখির শোকে আত্মহত্যা করে ১৩ বছরের কিশোরী জান্নাতুল ফেরদৌস। পরিবারের সাথে অভিমান করে মিশকাতুল আলম (১৭) নামের আরেক কলেজ ছাত্রও আত্মহত্যা করে।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত এক মাসে চট্টগ্রাম জেলায় এমন তুচ্ছ কারণে স্কুল- কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ আত্মহত্যা করেছে ১০ জন। উপরে কয়েকটি আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রেম ঘটিত কারণে, পরিবারের সাথে মান-অভিমান, মানসিক রোগে আক্রান্ত, পারিবারিক কলহের জেরে, পরীক্ষার প্রবেশপত্র হারিয়ে ফেলায় এবং পোষা পাখির মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে তাঁরা।
এদিকে, তরুণদের আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারী সেবামূলক সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, আত্মহত্যার দিক থেকে দেশে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। এ জেলায় গত আট মাসে শিক্ষার্থীসহ ৫১ জন নারী-পুরুষ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছে। এরমধ্যে ৩৪ জনই ছিল নারী। বাকি ১৭ জন পুরুষ। তথ্যে দেখা যায় আত্মহত্যায় এগিয়ে আছে নারীরা।
চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ নগরীতে এসময় ১২ বছরের নীচে ১০ জন শিশু পরিবারের সাথে অভিমানসহ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছে। ১৩ থেকে ১৯ বছরের ২৪ জন তরুণ- তরুণী এবং ২০ থেকে ৩৫ বছরের ১৭ জন যুবক- যুবতী আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়। এদের বেশিরভাগই প্রেমঘটিত কারণে এবং মানসিক হতাশার কারণেই আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেশিরভাগ আত্মহত্যার পেছনে কোনো না কোনো মানসিক রোগ রয়েছে। যেমন-বিষন্নতা, মদ্যপান ও মাদকের অপব্যবহার, সিজোফ্রেনিয়া ও ব্যক্তিত্বের রোগ। এছাড়াও চিকিৎসা বিজ্ঞানে বর্তমানে জন্মগত কারণকেও আত্মহত্যার কারণ মনে করা হয়।
সারাদেশের সমীক্ষা: আত্মহত্যা প্রতিরোধকে কেন্দ্র করে আঁচল ফাউন্ডেশন দেশ ব্যাপী একটি জরিপ করে। গতকাল শনিবার বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ক্রমবর্ধমান: কোন পথে সমাধান?’- শীর্ষক একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে। সমীক্ষায় দেখা যায়, সারাদেশে জানুয়ারি থেকে আগস্ট আট মাসে ৩৬১ জন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। শুধু স্কুল শিক্ষার্থী ছিল ১৬৯ জন, কলেজ শিক্ষার্থী ৯৬ জন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ৬৬ জন এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী রয়েছে ৩০ জন। এসব শিক্ষার্থীর মাঝে পুরুষ শিক্ষার্থী ছিলো ১৪৭ জন। অন্যদিকে নারী শিক্ষার্থী ছিলো ২১৪ জন। এখানেও আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা নারীদের বেশি।
বিশিষ্টজনদের মতে একাধীক কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে: প্রেমে ব্যর্থতা, একাকীত্ব, রাগ-অভিমান, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি, মিথ্যা অপবাদ, অতিচঞ্চলতা, মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, ভাল ফলাফলের চাপ, মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তি, বিনোদনের অভাব, পারিবারিক মেলবন্ধন তৈরি না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থী তথা নারী-পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে।
শিক্ষাবিদ প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলা বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার যে ঘটনাগুলো ঘটছে এগুলোর প্রথম এবং প্রধান কারণ পারিবারির অসচেতনতা। যদি পরিবার একটু সচেতন হয় তবে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাবে। সন্তান যখন বাবামায়ের মধ্যে কলহ দেখে বড় হলে তার মধ্যে এর একটি খারাপ প্রভাব পড়বেই। ব্যক্তি জীবনে সে মানসিকভাবে অসুস্থ থাকবে। আবার বাবা -মা দু’জনে চাকরীজীবী হওয়ায় সন্তানদের সময় না দেয়া। আবার ঘরে ফিরলেও তারা মোবাইলে আশক্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে বাবা মায়ের সাথে সন্তানের দূরত্ব তৈরি হয়। এদিকে আবার সন্তানের কাছে তাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে। যখন সন্তান তা পূরণ করতে পারে না তখন তাকে অন্যের সাথে তুলনা করে নানাভাবে ছোট করে। পড়াশোনার চাপ দিতে থাকে। একান্নবর্তী পরিবারের অভাবে সন্তানরা একা একা বেড়ে উঠে। এসব কারণেই তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। শিশুদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা পড়ালেখা বা সম্পর্কের ব্যর্থতাকে মেনে নিতে পারে। সন্তান যেন তাদের দুঃখ-কষ্ট মা-বাবার সাথে শেয়ার করে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তাদের সময় দিতে হবে। বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তাদের সংযুক্ত করতে হবে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রস্তাবনা:
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত ও সহজলভ্য করতে একটি টোল ফ্রি জাতীয় হট লাইন নম্বর চালু করা। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আবেগীয় অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল ও ধৈর্যশীলতার পাঠ শেখানো। শিক্ষার্থীদের নেতিবাচক পরিস্থিতি মোকাবিলা করার কৌশল, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং মানসিক বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে শেখানো। আত্মহত্যা সতর্কতা চিহ্ন সম্পর্কে ধারণা বিস্তৃত করা। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা। মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলি ইন্স্যুরেন্স বীমার আওতায় আনা যেন তা সকলের জন্য সাশ্রয়ী হয়। গণমাধ্যমে দায়িত্বপূর্ণ প্রতিবেদন লেখা ও প্রকাশ করা। যথাসম্ভব আত্মহত্যার বিস্তারিত বিবরণ ও ধরন বর্ণনা থেকে বিরত থাকা। বাবা মা এবং সন্তানের মাঝে মানসিক দূরত্ব কমাতে বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা। প্রতি ৩ মাস অন্তর অন্তর সকল শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং বাধয়তামূলক করা