এক যুগের বিবাহিত জীবনে
মোমেনা সংসার করেছে মাত্র দু’
মাস। এই সময়ের মধ্যে পরকীয়ায়
আসক্ত স্বামী যৌতুক নিয়েছে ৫
লাখ টাকা ও দুই ভরি স্বর্ণ।
মরিয়ম জাহান মুন্নি
চোখ ভরা স্বপ্ন আর বুক ভরা আশা নিয়ে ২০১০ সালে পাড়ি জমান স্বামীর সংসারে। কিন্তু সেই স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে গেছে। দীর্ঘ এক যুগের বিবাহিত জীবনে স্বামীর সাথে মাত্র দুই মাসের সংসার করার সুযোগ হয়। তাও ছিল বিভীষিকাময়। নেশাগ্রস্ত স্বামী অন্য বিবাহিত নারীর সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিল। যে কারণে বিয়ের রাতেই শিকার হন শারীরিক নির্যাতনে। দিন যত যায় বাড়তে থাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা। হঠাৎই মারা যান একমাত্র ভরসা বাবাটিও। মুহুর্তেই সব স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ভেঙে পড়েন, জীবনের প্রতি তৈরি হয় অনীহা। তবে দুঃখ কষ্টকে জয় করে একটা সময় আবার ঘুরে দাঁড়ান। মহিলা বিষয়ক কার্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে সেই সংস্থা থেকে পাওয়া ভাতার টাকায় শুরু করেন সেলাই, ব্লক বাটিকের কাজ। এরপর সরকারি যুব উন্নয়ন থেকেও প্রশিক্ষণ নিয়ে সেখান থেকে ৪০ হাজার টাকার ঋণ নেন। এভাবে একের পর এক বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে অবশেষে তাঁর সামনে ধরা দিয়েছে সাফল্য। তিনি এখন স্বাবলম্বী। লড়াই করে এতদূর আসা এই নারী সন্দ্বীপ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হারিছ মাঝি বাড়ির সন্তান মোমেনা বেগম।
এমন বিভীষিকাময় জীবন পার করেও দমে যাননি তিনি। অদম্য এই নারী সেই কষ্টের পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২৩ সালে মা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা পাঁচ জয়িতার একজন হয়েছেন তিনি। ‘নির্যাতনে বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করে’ এ ক্যাটাগরিতে জয়িতা হয়ে চট্টগ্রামের সন্দ¦ীপ উপজেলার মধ্যে সেরাদের সেরা হয়েছেন তিনি।
তার এ সাফল্য অর্জনের ফিছনের গল্প জানতে চাইলে মোমেনা বেগম বলেন, আমার বাবা হুমায়ুন কবির একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য ছিলেন। অভাবের সংসার হওয়ায় এসএসসি পাশ করার পর আর পড়ালেখা করাতে পারেননি। ২০১০ সালে আমাকে বিয়ে দিয়ে দেন। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আমিও বিয়ের জন্য তৈরি হই। কিন্তু বিধিবাম, বউয়ের সাজ মোছার আগেই বুঝতে পারি যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছি সে আমার না অন্য কারো। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোমেনা বলেন, স্বামী নিজের মুখেই বলছেন তার সাথে অন্য নারীর সম্পর্কের কথা। আমি যেন নাক না গলাই। আমার অল্প বয়স। এ কথাগুলো তখন সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না। আমি কান্না করি। তিনি তখনই আমার উপর আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন করেন। পরে জানতে পারি আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ছেলেকে যৌতুকের টাকার লোভে আমার সাথে বিয়ে দেন। বিয়ের সময় যৌতুকের দুই ভরি স্বর্ণসহ এক লাখ টাকা নগদে দিয়েছে আমার বাবা। কিন্তু বিয়ের রাত থেকে চলা ভয়ানক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলতেই থাকে। সে সারারাত বাইরে থাকে, ভোর রাতে লুকিয়ে ঘরে আসে। আমি এ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই আমারে মারধর শুরু করে। শ্বশুর-শাশুড়িকে বিচার দিলে তারা বলতেন তোমাকে এসেছি ছেলের চরিত্র ঠিক করতে। অভিযোগ না করে তার চরিত্র ঠিক কর। আমি অনেকভাবে চেষ্টা করতে থাকি তাকে ভালো করার। কিন্তু আমি যত তাকে ভালোবাসা দিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করছি সে ততই আমার উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এভাবে দুই মাস যাওয়ার পর আমার শ্বশুর শাশুড়ি সিদ্ধান্ত নেন ছেলেকে বিদেশ পাঠাবেন। এরজন্য প্রয়োজন তিন লাখ টাকার। এবার তারা আমাকে ডেকে আমার বাবা থেকে সেই তিন লাখ টাকা এনে দেয়ার কথা বলেন। আমি রাজি না হলে বাবা-মা এবং ছেলেসহ একসাথে টাকার জন্য নানাভাবে অত্যাচার শুরু করে। এমনও সময় গেছে দিনের পর দিন আমাকে না খাইয়ে রেখেছে। শীতের রাতে গায়ের জামা ছাড়া বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে। সিগারেটের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন। এরমধ্যে আমি সন্তান সম্ভাবা হয়ে পড়ি। আমি বাবাকে বলি আমার সন্তানের দিকে চেয়ে কিছু করতে। বাবাও কয়েকটা এনজিও থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সেই টাকা তাকে দিই। সে বিদেশ চলে যায়। যাওয়ার সময় আমাকে আমার বাপের বাড়ি রেখে যায়। এরপর টানা পাঁচবছর কোনো খবর নেননি। ভরণপোষণও দিতেন না। নানাভাবে তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। তার বাবা-মা’ও কোনো সহযোগিতা করেননি। এদিকে আমি আর আমার ছেলে বাবার বাড়িতে পড়ে আছি।
মোমেনা বলেন, পাঁচ বছর পর তিন মাসের ছুটিতে সে আবার দেশে আসে। যাওয়ার এক মাস আগে আবার আমাকে আনতে যায়। আমিও সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে সবকিছু ভুলে চলে আসি। কিন্তু তার এ আনার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল আরো এক লাখ টাকা আদায় করা। দু’দিন পরই সে আমাকে সংসারের মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে আবার বাবা থেকে এক লাখ টাকা এনে দিতে চাপ দেয়। টাকা দিলে সে আবার দেশের বাইরে যাবে। আমার সাথে সংসার করবে। অনিচ্ছাসত্বেও বাবার কাছে যাই। আমার সুখের জন্য আবারো বাবা ঋণ করে এক লাখ টাকা দেন। সেই টাকা তার হাতে তুলে দিই। এবারও সে আমাকে বাবার বাড়ি চলে যেতে বলেন। আমি মন না চাইলেও উপায় না পেয়ে চলে যাই। আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। পাঁচ বছর কোনো খবর নেই। পরে দেশে এসেও আর আমাকে নিলেন না। এরমধ্যে আমার দুঃখকষ্ট দেখে বাবা ভেঙে পড়েন। অসুস্থ হয়ে তিনি ২০১৭ সালে মারা যান। আমি বাবাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ি। এভাবে আমার ১২ বছরের বিবাহিত জীবনে সব মিলিয়ে স্বামীর সাথে ৬০ দিনের কম সময় সংসার করেছি।
উপায় না দেখে এক সময় মহিলা বিষয়ক কার্যালয় এবং যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেই। প্রশিক্ষণ শেষে যুব উন্নয়ন থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেই। আর মহিলা বিষয়ক কার্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ ভাতার টাকায় নিজেকে স্বাবলম্বী করার সংগ্রামে লিপ্ত হই। বর্তমানে আমি ব্লক-বাটিকের কাজ করে মাসে গড়ে হাজার বিশেক টাকা আয় করি। এছাড়া, আমি উপজেলা কৃষি অফিস থেকে ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে সার তৈরি ও বিক্রি করে প্রতি মাসে আরও দশ হাজার টাকা আয় করি। এসব কাজের পাশাপাশি আমি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার হিসাবে চাকরিও করছি। সেখানে প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা বেতন পাই। বর্তমানে প্রতি মাসে আমি চল্লিশ হাজার টাকা আয় করছি। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে অনেক ভালো আছি। ছেলে বর্তমানে সপ্তম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। যেহেতু, স্বামীর সাথে কোন যোগাযোগ নাই। অগত্যা গত বছর আমিই তালাক দিয়েছি।
্