নবযাত্রা প্রতিবেদক
৯০’এর দশকে আমরা যখন দেশীয় পোশাক নিয়ে কাজ করছিলাম তখন সারাদেশে হাতেগোনা কয়েকজন দেশীয় বুটিস নিয়ে কাজ করতো। সে সময়ে ভালোই চলছিল দেশীয় কাপড়ের তৈরি পোশাকগুলো। কিন্তু একসময় আমরা পাকিস্তানি-ভারতীয় ডিজাইনারদের তৈরি পোশাকের সাথে টেক্কা দিতে পারছিলাম না। এমন কিছু সমস্যার কারণে পুরোনো ডিজাইনাররা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। এভাবে প্রায় এক যুগের বেশি সময় জৌলুস হারায় দেশীয় বুটিক। তবে এখন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের ফ্যাশেন ডিজাইনার ‘রওশন বুটিক হাউসের কর্ণধার রওশন আরা চৌধুরী।
দীর্ঘ ১২ বছরের বেশি সময় পর দেশীয় পোশাকগুলো তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছেন। বর্তমানে দেশীয় ডিজাইনারদের তৈরি এ পোশাকগুলো পাকিস্তনি ও ভারতীয় কাপড়ের সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তার বাস্তব চিত্র দেখা যায় বিভিন্ন উৎসবের সময়। যেকোনো উৎসবে এখন ফ্যাশন সচেতন মানুষরা দেশীয় পোশাকগুলো কিনতে ভীড় করে বুটিক হাউসে। প্রতিযোগিতার বাজারে বিদেশী পোশাক ও সারাদেশ ব্যাপী পরিচিত কিছু ব্র্যান্ডের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের লোকাল হাউসগুলোও। তবে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তাদের। এমন কিছু তথ্য জানা যায় চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন বুটিক্স হাউসের কর্ণধারের সাথে আলোচনা করে।
মিমি সুপার মার্কেটের ‘সাইমাস ক্রিয়েশন’এর কর্ণধার সাইমা সুলতানা বলেন, দীর্ঘ ১২ বছর যাবত দেশীয় পোশাক নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ডিজাইনিংয়ের কাজ করছি। এনটিভির ‘স্টাইল গুরু’ রিয়্যালিটি শো থেকে মোস্ট পপুলার ডিজাইনার এওয়ার্ডসহ বেশ অনেকগুলো এওয়ার্ড পেয়েছি আমি। বর্তমানে নিজেই ডিজাইন করা পোশাক নিয়ে শোরুম খুলেছি। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আমাদের দেশীয় ডিজাইনারদের তৈরি পোশাক এখন আন্তর্জাতিক মানের পোশাকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। প্রতিবছর ঈদ, পূজাসহ নানারকম বাঙালি উৎসবে আমাদের দেশীয় ডিজাইনাররা অসাধারণ কিছু ডিজাইন নিয়ে আসে। এগুলোর আবার ক্রেতা চাহিদাও অনেক বেশি দেখা যায়। আমাদের দেশীয় ফ্যাশন ডিজাইনাররা আরো এগিয়ে যেতে পারতো। তবে আমাদের কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যেগুলো এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি ইন্ডিয়া থেকে ফ্যাশন ডিজাইনের উপর পড়াশোনা শেষ করেছি। চট্টগ্রামে আমার দুইটা আউটলেট আছে, তবে সারাদেশ ব্যাপী কাজ করছি।
‘শৈল্পিকের’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক এইচএম ইলিয়াস বলেন, আমাদের একচেটিয়া দেশীয় ডিজাইন করা পোশাকগুলো এখনো খুব একটা চলে বলা যাবে না। দেশীয় কাপড়গুলোর সাথে বাইরের ফেব্রিক মিক্স করে পোশাক তৈরি করতে হচ্ছে। দুইয়ের কম্বিনেশনে তৈরি পোশাকগুলোর চাহিদা বেশি। কারণ মানুষ এখন ওয়েস্টার্ন ড্রেসও চায় আবার দেশীয় ইমেজের পোশাকগুলোও চায়। তাই ক্রেতাদের রুচি চিন্তা করে বাজারে পোশাক আনতে হচ্ছে। একারণে এখন দেশীয় ডিজাইনের পোশাকগুলো কিছুটা ভালো অবস্থানে যাচ্ছে।
খুলশী কনকর্ড টাওয়ারের স্ট্রাইপ ফ্যাশন হাউসের কর্ণধার সাদমান সাঈকা সেফা বলেন, দেশীয় বুটিক আরো ভালো করতো, যদি নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার সমাধান করা যেত। বিশেষ করে বড় সমস্যা হচ্ছে পোশাক তৈরির কাঁচামালের দাম অনেক বেশি। তারউপর আমাদের কিছু লিমিডেট উপকরণ নিয়ে কাজ করতে হয়। অথচ ভারত-পাকিস্তানে তারা অনেকগুলো উপকরণের মিশ্রণে কাজ করে। তাদের এ কাপড়গুলো আমাদের দেশে চাহিদাও বেশি। অল্প দামেও পাওয়া যায়। আমরা কাজ করি মূলত সফুরা সিল্ক, মসলিন, জামদানি, খাদি, কটন, তাঁত এমন কিছু নির্দিষ্ট উপকরণ নিয়ে। কিন্তু এগুলো এখন অনেক দামে বিক্রি হচ্ছে। এত দামের মধ্যেও যখন কোনো প্রোডাক্ট তৈরি করি দেখা যায় বিক্রির সময় ক্রেতার সাথে দামের তারতম্য হয়। পাশাপাশি দক্ষ কারিগরের অভাব রয়েছে। আবার আমরা যারা নারী উদ্যোক্তা আছি ব্যাংক থেকে লোন নিতে গেলে তারা ঋণ দিতে চায় না। বাবা বা স্বামীর বিভিন্ন রকম কাগজপত্র খুজে।
চট্টগ্রামের পুরোনো বুটিক হাউস ‘অনিন্দ্র’এর কর্ণধার লুৎফা সানজিদা বলেন, আমি ১৯৮৯ সালে দেশীয় পোশাক নিয়ে কাজ শুরু করি। তখন চট্টগ্রামে আমরা অল্প কয়েকজন দেশীয় বুটিক নিয়ে কাজ করি। আমি রাজশাহী, সফুরা, জুয়েলসিল্ক, কটন ও তাঁত নিয়ে কাজ করতাম। পরে ভারত-পাকিস্তানের কাপড়গুলো চল আসে। এরা আমাদের টেক্কা দেয়। আমরা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ি। কারণ তখন হঠাৎ করে গজ প্রতি ১০০-১৫০ টাকা দাম বেড়ে যায়। এ দামে পোশাক তৈরি করে বিক্রি করা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে গেছে। এভাবে আমরা দেশীয় ডিজাইনাররা দুর্বল হতে থাকি। এখন আশার আলো দেখছি দেশীয় বুটিক হাউজের। এখনের ডিজাইনাররা ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে আগে পড়াশোনা করছে, তারপর তারা ব্যবসা শুরু করছে। তাই তারা কিন্তু ভালোও করছে। আমরা ডিজাইন বিষয়ে পড়াশোনা করিনি। ছোটবেলায় মায়ের সাথে সুই-সুতার কাজ দেখে শিখেছি। পরে একটা সময় নিজে কিছু করার ইচ্ছে থেকে দেশীয় পোশাক নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম।