মা, ভাইয়া কোথায়! কবে আসবে?

বোয়ালখালী উপজেলার
খরণদ্বীপ শেখ পাড়া

পূজন সেন, বোয়ালখালী  
‘মা, ভাইয়া কোথায়? কবে আসবে?’ সিয়ামের বোন জান্নাতের এ প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা নেই মায়ের। সিয়ামের কথা উঠতেই আঁচলে চোখ মুছেন মা। বাঁধ মানে না চোখের জল, গড়িয়েই পড়ে। সিয়ামের সাথে সাথে কথারা সব হারিয়ে গেছে, নির্বাক মা।
বোনের খেলার সাথী ছিল ওমায়েদ হোসেন সিয়াম। গত ৩ জুলাই দুপুরে গোসল করতে গিয়ে সিয়াম কর্ণফুলী নদীতে ডুবে মারা যায়। সিয়াম যে আর নেই তা জানে না বোন জান্নাতুল আলফা মাওয়া। বোয়ালখালী উপজেলার খরণদ্বীপ শেখ পাড়ার মাওলানা আবদুল মাবুদের ছেলে সিয়াম। সে স্থানীয় জৈষ্ঠ্যপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ত।
জান্নাত ভাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। মা-বাবা বলেছে সিয়াম মদিনা শরীফে গেছে। তাই জান্নাত প্রতিদিন দোয়া করে তার বাবাকে যেন মদিনা শরীফে যাওয়ার তৌফিক দেন।
২০১৫ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি সিয়ামের জন্ম। জান্নাতের বয়স ৫ বছর। তারা ভাই-বোন মিলে খেলাধুলা ও পড়ালেখা করতো।
পূর্বকোণকে গত ১৫ জুলাই কথাগুলো বলেন সিয়ামের মা শামীম আকতার। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেটা তেমন কোনো দুরন্তপনা করতো না। শুধু একটা সাইকেল চেয়েছিল। অভাবের সংসার হওয়ায় ছেলেটাকে সাইকেল কিনে দিতে পারিনি।’  
সিয়ামের মা বলেন, ‘মানুষ করতে চেয়েছিলাম ছেলেকে। সেই জন্য বাড়িতে দুইবেলা প্রাইভেট শিক্ষক রেখেছিলাম। ছেলেটা নিয়মিত স্কুলে যেতো। সকাল-বিকেল দুইবেলা প্রাইভেট পড়তো। সিয়ামের হরমোন জনিত সমস্যা ছিল। সেই কারণে চিকিৎসা করাছিলাম। আপনারা আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন।’
সিয়ামের বাবা আবদুল মাবুদ একটি মসজিদের ইমাম। তিনি বলেন, ‘সেইদিন সিয়াম, আমি ও সিয়ামের মামা একসাথে গোসল করার জন্য নদীতে গিয়েছিলাম। কোনো ফাঁকে যে সিয়াম পানিতে ডুবে গেল তা বুঝতে পারিনি। সাঁতার না জানার কারণে সিয়াম চলে গেল’।
অশ্রুসিক্ত আবদুল মাবুদ বলেন ‘সিয়াম যে নেই তা কি করে বলি মেয়েটাকে। শুধু জানতে চায় ভাইয়া কোথায়। সিয়ামের কাপড়-চোপড় সব আগের মতোই পড়ে আছে। সিয়াম কখনো আমার মতো হুজুর হবে আবার কখনো বলতো মদিনা শরীফ যাবে। তাই জান্নাতের ধারণা সিয়াম মদিনা শরীফে গেছে।’
সিয়ামদের মাটির ছোট ঘরটিতে এখন হাহাকার। সিয়ামের সব স্মৃতি জ্বলজ্বল করছে মা-বাবা ও বোনের কাছে। পাড়া প্রতিবেশিরা, খেলার সাথীরাও সিয়ামের জন্য শোকে কাতর।
শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের সাবেক সদস্য সিয়ামদের প্রতিবেশী মো. ইব্রাহীম বলেন, ‘আমাদের পাড়ায় দুই- একটি পুকুর রয়েছে। এইসব পুকুর এখন মজা পুকুরে পরিণত হয়েছে। কেউ আর ব্যবহার করেন না। ঘরে ঘরে টিউবয়েল। অনেকে পাড়ার পাশে থাকা নদীতে গোসল করতে যান। আজকাল মানুষ এতো ব্যস্ত হয়ে গেছে যে ছেলেমেয়েদের সাঁতার শেখানোর সময় পান না। সাঁতার জানলে হয়তো সিয়ামকে হারাতাম না।’

অসুস্থ মা বিছানায় শুয়ে
খুঁজছে মেয়েকে

সাতকানিয়ার ছদাহা ফকির
পাড়ায় পুকুরে ডুবে শিশু মৃত্যু

ইকবাল মুন্না,সাতকানিয়া:
‘মামুনি কোথায় চলে গেলে তুমি! আমার কাছে আস। তোমাকে ছাড়া আমিযে থাকতে পারছি না। না হয় আমাকেও তোমার সাথে নিয়ে যাও’। ছোট্ট ফারিয়া জান্নাত আইরা (৩) মা মুন্নী আক্তার অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানায় কাতরাতে কাতরাতে মোবাইলে মেয়ের ছবি দেখে এভাবেই কান্না করে যাচ্ছেন।
বাবা- মায়ের একমাত্র সন্তান আইরা। ছোট্ট আইরাকে নিয়েই তাদের যত হাসি আনন্দ ছিল। কিন্তু আজ সেই আইরা শুধু একটা ছবি মাত্র। যে ছবি দেখে বাবা মা দুইজনেই কান্না করছেন। কান্না করছেন নানা-নানী, দাদা-দাদীসহ আত্মিয়রাও। গত ১ জুলাই সাতকানিয়ার ছদাহা ফকির পাড়ায় নানার বাড়িতে বাড়ির পাশে পুকুরে ডুমে আইরা নামের এ শিশু মৃত্যুবরণ করেন।
আইরার বাবা জাহেদুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ঈদুর আযহার দু’দিন আগে আমার স্ত্রী মুন্নি আক্তারের অপারেশন হওয়ায় সে আমার শাশুর বাড়িতে যায়। তাকে দেখাশোনা করতে সেখানে রেখে আসি। কোরবানের দু’দিন পর সবার চোঁখের আড়াঁলে আইরা পুকুরে পড়ে যায়। সে আমার একমাত্র সন্তান। তাকে হারিয়ে জীবনটা আমাদের এলোমেলো হয়ে গেছে। এখন আমার অসুস্থ স্ত্রী বিছানায় শুয়ে শুধু মেয়েকে খুঁজছে। প্রতিটি পিতামাতাকে বলবো, তাদের সন্তানকে যেন চোঁখে চোঁখে রাখে। সন্তান হারানোর বেদনা যে কত কষ্ট সেটি যে হারিয়েছে সেই যানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *