লোকচক্ষুর অন্তরালে আয়কর বিভাগের আর্কাইভ রয়েছে মোগল ও বৃটিশ আমলের গুরুত্বপূর্ণ দলিল

নবযাত্রা প্রতিবেদক

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৬৫ সালে বানিজ্যের উদ্দেশে আসা একটি জাহাজ। তার পাশেই সাজানো ১৯১৫ সালে ভারতযাত্রার সময় ব্রিটিশ নাবিকদের ব্যবহৃত দুরবিন। রয়েছে সে সময়ের প্রাচীন রেল ইঞ্জিনের রেপ্লিকাসহ ব্রিটিশ শাসনামলে ব্যবহৃত কলম, কালিদানী, টাইপিন, চশসা, ১৭৮৭ সালের রেভিনিউ বোর্ড অব ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট জন সোয়ার মুর্তি। আরো আছে ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দেয়া ভারতযাত্রার অনুমতি পত্র। এখানে দেখা যায় কোম্পানি আমল থেকে শুরু করে সম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার চিত্র। প্রায় ৪শ বছরের পুরানো ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন নিয়ে সেজে উঠেছে নগরীর আগ্রাবাদ সিজিও ভবনের তৃতীয় তলার আয়কর বিভাগের আর্কাইভ।

পাকভারত উপমহাদেশে বানিজ্যের উদ্দ্যেশে ১৬০১ সালে ব্রিটিশদের আগমনের পর দীর্ঘ ২শ’ বছরের শাসনামলে আয়কর বিষয়ক নানান গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্র রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র এবং এশিয়া মহাদেশের প্রথম চট্টগ্রাম আয়কর অ লের এ আর্কাইভ।
কিন্তু চট্টগ্রামে এমন গুরত্বপূর্ণ ও দামী নির্দশন নিয়ে একটি আর্কাইভ থাকলেও রয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে। ২০১৪ সালে কর কমিশনার সৈয়দ মোহাম্মদ আবু দাউদের হাতেই তৈরি হয় এ আর্কাইভ। তবে আট বছর ধরে অন্ধকারে রয়েছে কর বিভাগের এ সংগ্রহগুলো।
সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম আয়কর অ ল-২ এর ভেতরে প্রবেশ করে একটু ভেতরে গেলেই চোখে পড়ে প্রায় ৪শ বছরের পুরাতন ব্রিটিশ শাসকদের গুরুত্বপূর্ণ এসব নিদর্শনগুলো। আর্কাইভে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি কর্ণারসহ থরে থরে সাজানো রয়েছে পুরাতন এ প্রদর্শনীগুলো। এর পাশেই গুহার মত করে তৈরি করা হয়েছে একটি রুম। এ ঘরে দেখা যায় সেই সময়কালেন রৌপ্য, তাম্র ও বাংলাদেশী প্রাথমিক মুদ্রা।

আর্কাইভের বাইরে করিডোরের দেয়ালে ঝুলানো আছে ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতযাত্রার অনুমতি পত্র। সেই অনুমতি পত্রের পরই উপমহাদেশ শুরু হলো জেমস লাঙ্কাস্টারের নেতৃত্বে কোম্পানির ভারত অভিযান। আরো রয়েছে ১৬১৫ সালে স¤্রাট জাহাঙ্গীর থেকে ভারতে বাণিজ্য করার অনুমোদন নিয়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা বাণিজ্যঘাঁটির কয়েকটি পত্র, রানি এলিজাবেথ-১ এর একটি তৈলচিত্র। এরপর চোখে পড়ে ১৬১৫ সালে স¤্রাট জাহাঙ্গীর ব্রিটিশ দূত থমাস রোকেকে ইংরেজদের ভারতে বাণিজ্য করার অনুমতিপত্র হস্তান্তর করছেন। এভাবে করিডোরে দেয়ালে ঝুলানো বিভিন্ন দলিল ও চিত্র।

বিষয়টি নিয়ে কর অ ল-১ এর কর কমিশনার সৈয়দ মোহাম্মদ আবু দাউদ বলেন, পেশাগত কাজে ২০১০ সালের দিকে আমি অস্ট্রেলিয়া যাই। সেখানে এ রকম একটা আর্কাইভ দেখি। সেখান থেকেই আমরাও একটি আর্কাইভ করার ইচ্ছে জন্মায়। যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তাদের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিভাগগুলো নিজস্ব ইতিহাস ও তথ্য নিয়ে আর্কাইভ তৈরি করে। আমিও তাই আমাদের ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, নথীপত্র নিয়ে এ আর্কাইভটি তৈরি করি।

তিনি আরো বলেন, এটি নিয়ে আমাদের বড় একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে। এটি চট্টগ্রামে ছোট একটি রুমে আবদ্ধ হয়ে আছে। অনেকে এটির বিষয়ে জানেও না। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্মকে এ গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ সম্পকে জানা দরকার। কারণ এখনে ব্রিটিশদের শাসনামল থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। এগুলো ভবিষ্যতে গবেষণার কাজেও সাহায্য করবে। তিনি আরো বলেন, সেই চিন্তা থেকেই সবার দেখার সুযোগ করে দিতে আগামীতে এটি আরো বড় পরিসরে সবার সামনে আনার চেস্টা চলছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় রাজস্ব ভবনের আর্কাইভের জন্য পাঁচ হাজার বর্গফুটের জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজটি শুরু হলেও সেখানে জাতীয় পর্যায় উন্মুক্ত হোক এটা আমরা সবাই চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *