মাজারের দানবাক্স ইস্যু বিতর্কের মধ্যে সরানো হলো সিলেটের ডিসিকে

নবযাত্রা ডেস্ক

সিলেটে ‘মাজারকাণ্ডে’ লাইমলাইটে ছিলেন ডিসি সারওয়ার আলম। এমন ঘটনা অতীতে কেউ ঘটাননি। সাহস পাননি বা বিতর্ক এড়াতে কেউ-ই করেননি মাজারের তহবিলে হস্তক্ষেপ। শত শত বছর ধরে একই রীতিতে চলছিলো মাজার। সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের চিঠির প্রেক্ষিতে ওখানেই হাত দেন ডিসি। শুধু দেনই নি, হযরত শাহজালাল (র.) ও শাহপরান (রহ.) মাজারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনসার পাহারায় দানবাক্সও বসিয়েছেন। এ কর্মকাণ্ড নিয়ে ডিসিকে নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে তখন গতকাল প্রত্যাহার করা হয়েছে ডিসি সারওয়ার আলমকে।

এ সংক্রান্ত সরকারি আদেশও গোপন থাকেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ায়। অনেকেই বলছেন নেপথ্যে শক্তিধর মাজার সিন্ডিকেট। ডিসির বিদায়ে লাভ হবে খাদেম অংশের। দেশের বহুল আলোচিত এ প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাদাপাথর কাণ্ডের ঘটনার পর গত বছরের আগস্টের শেষ দিকে এসে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে নানা ঘটনায় তিনি আলোচিত-সমালোচিত হওয়ার পাশাপাশি প্রশংসিত হন। রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়েছে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপ-সচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে। একইদিন আদেশটি জারি করা হয়েছে বলে জানানো হয়।

তবে ডিসি প্রত্যাহারের খবরে মাজারের খাদেম অংশের লোকজন নীরব রয়েছেন। এ ব্যাপারে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি। এদিকে আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত পুণ্যভূমি সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক পুলিশি উপস্থিতিতে নতুন দানবাক্স স্থাপন ও পূর্বের ডেগ ও দানবাক্স সিলগালা করার আকস্মিক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এক বিবৃতিতে তারা বলেছেন- শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ও স্বাধিকারী এই দরগাহে এ ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ স্বাধীন বাংলাদেশে অতীতে কখনো দেখা যায়নি। মাজারের দান-খয়রাত ও মানতের অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক তা সবারই কাম্য। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি এখতিয়ার বা আদালতের নির্দেশনা ছাড়া, প্রশাসন কর্তৃক যে প্রক্রিয়ায় দরগাহ’র অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, তাতে সিলেটের সর্বস্তরের সচেতন জনসাধারণ গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ।

এই ঘটনা দরগাহ ও মাজার সংস্কৃতিবিরোধী একটি বিশেষ মহলের দীর্ঘদিনের অভিসন্ধি পূরণের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, তা জনমনে তীব্র সংশয় ও আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে। তারা বলেন আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে, পীর-আউলিয়াদের মাজার স্রেফ কোনো ইট-পাথরের কাঠামো কিংবা ওখানে থাকা দানবাক্স কিংবা ডেগ স্রেফ টাকা জমার উপকরণ নয়; এগুলো মূলত সুফি-সাধকদের মরমি প্রেমের পবিত্র আঙিনায় আত্মিক আশ্রয়ের জন্য আসা মানুষের নিঃশর্ত নিবেদন ও ভালোবাসা। যা কোনো জাগতিক পরিমাপ বা টাকার অঙ্কে মাপা অসম্ভব।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আব্দুল করিম কিম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, বিশিষ্ট নেফ্রোলজিস্ট মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর ইমেরিটাস ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সহ-সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী তবারক হোসেন, সিলেট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা বাবরুল হোসেন বাবুল, সাবেক অতিরিক্ত মহা-পুলিশ পরিদর্শক (এআইজি) মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ বজলুল করিম বিপিএম, প্রবীণ রাজনীতিবিদ এডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্য, প্রবাসী সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা রফিক উদ্দিন চৌধুরী রানা, গুলশান নিকেতন সোসাইটির প্রাক্তন সভাপতি প্রকৌশলী হাবিব আহসান বাবলু, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন, কবি শামীম আজাদ, নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের ইন্সপেক্টর আব্দুল্লাহ খোন্দকার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হ্যারল্ড রশীদ, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেটের সভাপতি এডভোকেট সৈয়দা শিরীন আক্তার ও সাবেক সভাপতি এডভোকেট ইরফানুজ্জামান চৌধুরী, বিশিষ্ট ঐতিহ্য সংগ্রাহক ও ধরা সিলেটের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী (বাহার) প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *