মরিয়ম জাহান মুন্নী
ফেসবুকে ‘দোলনা কালেকশন’ নামের একটি পেজে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে আগাম ১৯শ’ টাকা পরিশোধের মাধ্যমে দু’টি কাপড় ইস্ত্রি (লন্ড্রির আয়রন) টেবিল অর্ডার দেন নাজিয়া সিদ্দিকা ও তার বোন জাকিয়াতুন নূর। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্ডার করা টেবিল বুঝে না পেলে যোগাযোগ করেন উল্লেখ্য গ্রুপটির সাথে। তবে তারা টাকার কথা অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত টাকাও ফেরত পেলেন না আবার টেবিলটিও পেলেন না। একইভাবে ফেসবুকের ‘ট্রেন্ডি সজিব হাসান’ নামের একটি পেজ থেকে ৯৫০ টাকা দামের ৩২ পিসের একটি ডিনার সেট অর্ডার করতে আগাম ২৫০ টাকা বিকাশ করেন সাবিনা ইয়াসমিন। কিš‘ এটিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বুঝে না পেলে যোগাযোগ করতে গিয়ে তিনি দেখেন মোবাইল নম্বর ব্লক এবং ফেসবুক পেজও খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে অন্য কোনো নম্বর থেকে কাস্টমার সেজে যোগাযোগ করলে আবারো বিকাশে টাকা পাঠাতে বলে।
শুধু নাজিয়া সিদ্দিকা, জাকিয়াতুন নূর কিংবা সাবিনা ইয়াসমিন নয়। তাদের মতো অনেকেই অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। করোনাকালে দেশে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সমান্তরাল হারে বেড়েছে সাইবার অপরাধও। তখন থেকেই ই-কমার্সে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে আসছেন মানুষ। তবে গত এক বছরের তুলনায় চলতি বছরে প্রতারণার হার কমেছে বলে জানায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ চট্টগ্রাম।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ চট্টগ্রামের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম জেলায় ২০২১-২০২২ (জুলাই- জুন) অর্থবছরে অনলাইনে কেনাকাটা করে প্রতারিত হয়েছে ২৯০ জন মানুষ। প্রতি মাসে গড়ে ২৪টি অভিযোগ পড়েছে। অন্যদিকে ২০২২-২০২৩ (জুলাই- মে) মোট ১০ মাস ১৫ দিনে ৩৭জন প্রতারণার শিকার হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৪টি অভিযোগ পড়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, অনলাইন কেনাকাটায় প্রতিমাসেই কম-বেশি মানুষ প্রতারণায় শিকার হয়। এরমধ্যে সব অভিযোগ যে ভোক্তা অধিকারে করা হয় এমনও না। কারণ অনেকে এখনো জানেইনা এখানে অভিযোগ করার সুযোগ আছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে বলা যায় এবছর ১১ মাসের হিসেবে প্রতারণার হার কমেছে।
সাইবার ক্রাইম এওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএ ফাউন্ডেশন)’র গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, দেশে যত ধরনের সাইবার অপরাধ হয়, তার মধ্যে ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশই অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার ঘটনা। প্রতারিত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছর। আবার গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুরুষরাই অনলাইন কেনাকাটায় বেশি প্রতারণার শিকার হয়েছে। প্রতারিতদের মধ্যে পুরুষ বেশি।
ই-কর্মাস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) যুগ্ম সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম ই-কর্মাসের ডিরেক্টর ইনচার্জ নাছিমা আক্তার নিসা বলেন, ২০১৫- ২০২১ সালের মধ্যে যেভাবে মানুষ অনলাইনে পণ্য কিনে প্রতারিত হয়েছে। এখন সেটা অনেক কমেছে। কারণ ই-কমার্সের সাথে যারা জড়িত তাদের মধ্যে বেশিরভাগ উদ্যোক্তা ব্যবসা এগিয়ে নিতে সরকারি নিয়ম নীতিগুলো মেনে চলতে চেষ্টা করে। এরমধ্যে কিছু ভুয়া অনলাইন পেজ অবশ্যই আছে। এগুলোর মাধ্যমেই মূলতঃ মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। প্রতারণা থেকে রেহাই পেতে হলে গ্রাহকদেরকে অব্যশই সরকারি নিবন্ধনকৃত অনলাইন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পণ্য কিনতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনবে তার আগে সেই সাইডটিতে ঢুকে তাদের রেজিস্ট্রেশন কোড আছে কি না তা দেখতে হবে। ভালো রিভিউ আছে কি না দেখতে হবে। যদি চট্টগ্রামে কোনো গ্রাহক অনলাইনে পণ্য কিনে প্রতারণার শিকার হয় এবং তারা যদি আমাদেরকে অভিযোগ করে তারা যাদের থেকে পণ্য কিনেছে তাদেরকে প্রেশার দিই যাতে সমস্যার সমাধান করে। আর যদি না করে তবে তাদেরকে আমাদের হাতে যতটুকু ক্ষমতা আছে তাই করি কিংবা ভোক্তা অধিকারে অভিযোগের জন্য নিয়ম বলে দিই। আমাদের যেসব রেজিস্ট্রেশন করা পেজগুলো আছে সেগুলো থেকে তাদের বাদ করে দেয়া হয়।
চট্টগ্রাম জোনের ই কর্মাস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম জোনাল কমিটির চেয়ারম্যান ও মিম টেকনোলজিস শহিদুল আলম বলেন, বানিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধন করে একটি কোড নিতে হয়। এটি যাদের আছে তারাই মূলত আসল অনলাইন ব্যবসায়ী। কিš‘ এখন অনেকেই ফেসবুকে একটি পেজ বা গ্রুপ খুলে পণ্য বেচাকেনা শুরু করে দিয়েছে। এ শ্রেণীর পেজগুলোই মূলত গ্রাহকদেরকে এক রকম পণ্য দেখিয়ে অন্য রকম পণ্য দিয়ে প্রতারিত করছে। বিকাশে কিছু টাকা আগাম নিয়ে পণ্য ডেলিভারি দেয় না। গ্রাহকদেরকে এসব অনলাইন গ্রুপগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। গ্রাহকরা সচেতন হলেই প্রতারণা অনেকাংশে কমে যাবে।
আফরোজা আক্তার নামের এক ক্রেতা বলেন, এবার ঈদে একটি ফেসবুক পেজ থেকে থ্রি-পিস অর্ডার দেই। হাতে পাওয়ার পর দেখলাম সেটি অর্ডার দেয়া পণ্যের সঙ্গে তার মিল নেই। নিন্মমানের কাপড় পাওয়া মাত্রই যোগাযোগ করলে তারা নানারকম তালবাহানা শুরু করেন