বিহারি পল্লিতে ঈদ ঘিরে বেড়েছে ব্যস্ততা

জান্নাতুল ফাহিম

চতুর্ভুজ আকৃতির কাঠের ফ্রেমে টান টান করে আটকানো জর্জেটের গোলাপি রঙ্গের একটি পোশাক। সেই কাপড়ে মনোযোগ দিয়ে চুমকি পাথর বসানোর কাজ করছেন কারিগর তানভির। কথা বলতে চাইলে অনেকটা বিরক্তির সুরে বলেন এখন কথা বলার সময় নেই। অনেক কাজ পড়ে আছে, সময় মত জমা দিতে না পারলে বকা দিবে। তার সাথে আলাপ আর বেশি দূর এগুনো গেলোনা। ফিরে যাই পাশের আরেক কারিগর ফরহাদের কাছে। সেও খুব ব্যস্ত। তবে কাজের ফাঁকে টুকিটাকি কথা হয় তার সাথে। শুধু তারা দুইজনই নয়, কাজের চাপে কথা বলার সময় নেই কারো। আসন্ন ঈদুল ফিতরতে কেন্দ্র করে নগরীর খুলশী ঝাউতলার বিহারি পল্লির বুটিক হাউসগুলোতে দম পেলার ফুরসত নেই কারিগরদের।

গতকাল বিকেলে নগরীর আমবাগান বিহারি পল্লির বুটিক হাউসে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। কারিগরদের যেন মাথা তোলার সময় নেই। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন কাপড়ে জরি, পুঁতি, পাথর ও চুমকি বসানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। বুটিক হাউসের মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবার ঈদ উপলক্ষে ১৫-২০ লাখ টাকার কাজের অর্ডার পেয়েছে বিহারি পল্লির একেকটি বুটিক হাউস। এই হিসাবে ১৫টি বুটিক হাউস দেড় থেকে দুই কোটি টাকার কাজের অর্ডার পেয়েছে।

সরেজমিনে পাহাড়তলী ডিগ্রী কলেজের সামনে ৮ নং লাইন, ওয়ার্লেস কলোনীতে ঘুরে দেখা যায়, থান কাপড়ের ওপর পুঁতি, পাথর, চুমকি দিয়ে সাথে জরি ও রেসমি সুতার তৈরি করা হচ্ছে নানা ডিজাইনের শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রিপিস ও পাঞ্জাবিসহ বাহারি পোশাক। এসব জারদৌসি ও কারচুপি কাজের পোশাকগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই মেয়েদের টু-পিস, থ্রি-পিস, ফোর-পিস ও লেহেঙ্গা রয়েছে। জর্জেট, শিফন, টিস্যু, সিল্ক ও বেলবেট কাপড়ের ওপর সুই-সুতার সাহায্যে পুঁতি, জরি, স্প্রিং ও চুমকির করা নকশা নজর কাড়ছে।

চয়েস কারচুপি হাউসের স্বত্বাধীকারি মোহাম্মদ জালাল বলেন, এখানের সবচেয়ে বড় হাউস আমারটা। বর্তমানে ১৯ জন কারিগর আছে। যদিও গত এক বছর ধরে সারাবছরই ভালো কাজের অর্ডার ছিল। কিন্তু ঈদকে কেন্দ্র করে বড় বড় ফ্যাশন হাউসের অর্ডারও বেড়েছে। জানুয়ারির পর থেকে অর্ডার বন্ধ করে দিয়ে। আগের অর্ডারের কাজ শেষ করতে পারিনি এখনো। এবার এখানে বেশ ভালো ব্যবসা হচ্ছে।

জানা যায়, এখানে একসময় শতাধিক বুটিক হাউস থাকলেও বর্তমানে ১৫টি বুটিক হাউস রয়েছে। সেগুলোও এখন আবার ছোট হয়ে গেছে। যেকারণে এসব দোকানের উপর কাজের চাপ বেশি। শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কাজের অর্ডার আসে।

আনুশা বুটিক ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শহিদ বলেন, প্রতি বছর ঈদে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ব্যস্ততা অনেক বেশি থাকে। তবে করোনা পরবর্তী সময়ে এবারের ঈদে বেশ ভালো অর্ডার পড়েছে। করোনার সময় এখানের ব্যবসায়ীদের বাজে অবস্থা ছিল। যা গত দুই বছরেও কাটিয়ে উঠা যায়নি। আশা করছি এবার করোনার ধাক্কা কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পারবো। এবার অনেক অর্ডার পেয়েছি। অনেক নামীদামি শোরুম নানা ডিজাইনের কাজের অর্ডার দিয়েছে।

ব্যবসায়ী লোকমান আমিন বলেন, এখন আগের মত মানুষের জারদৌসি ও কারচুপি কাজের প্রতি আগ্রহ নেই। যেকারণে এই পেশায় নতুনরা আসছে না। এতে কাজের ক্ষেত্রে আমাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বুটিক হাউসগুলোতে কারিগরের সংকট দেখা দিয়েছে। এজন্যও অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এবার অর্ডার বেশি পড়েছে ঠিকই। কিন্তু কারিগরের অভাবে অনেক অর্ডার বাদ দিতে হয়েছে। এখানের তৈরি কারুকাজ সজ্জিত পোশাক ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের নামীদামি দোকান ও শোরুমে বিক্রি হয়। এসব পোশাক মার্কেটে দুই হাজার থেকে লাখের কাচাকাচি দামেও বিক্রি হয়। আমাদের কাজের মজুরি নির্ভর করে ডিজাইন ও পণ্যের উপর। একটি পোশাকে মজুরি গড়ে ৫শ – ১০ হাজার টাকার বেশিও পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *