নবযাত্রা ডেস্ক
আজ ৯ জুন, আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস। ঐতিহাসিক নথিপত্রের গুরুত্ব এবং যে আর্কাইভ পেশাদাররা সেগুলি সংরক্ষণ করেন, তাদের সম্মান জানাতে প্রতি বছর ৯ জুন আন্তর্জাতিক সংরক্ষণাগার বা আর্কাইভ দিবস পালিত হয়। ১৯৪৮ সালের ৯ জুন ইউনেস্কোর পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তর্জাতিক আর্কাইভ পরিষদ (আইসিএ) প্রতিষ্ঠার স্মরণে এই দিনটি পালিত হয়। ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক আর্কাইভস পরিষদ (আইসিএ) এই দিবসটি ঘোষণা করে।
ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি আর প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের সামনে আর্কাইভসের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্যই এ দিবসের সূচনা করে আইসিএ। ইতিহাস, মানবাধিকার রক্ষা এবং সরকারি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংরক্ষণাগারের ভূমিকা তুলে ধরতেই এই দিনটি বিশ্বজুড়ে পালন করা হয়।

একটি জন্মসনদ, একটি চুক্তিপত্র কিংবা কোনো সৈনিকের হাতে লেখা চিঠি—সবই ইতিহাসের অংশ। এসব স্মৃতি ও তথ্য সংরক্ষিত থাকে সংরক্ষণাগারে। সংরক্ষণাগার মূলত মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ করে রাখে। ভূমি মালিকানা, নাগরিকত্ব, আদালতের রায়, চাকরির তথ্যসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দলিল এখানে সংরক্ষিত থাকে। যা শুধু গবেষকদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংরক্ষণাগার না থাকলে সমাজের সম্মিলিত স্মৃতি হারিয়ে যেতে পারে। আইনগত অধিকার প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, ইতিহাস বিকৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং সরকারের কাজকর্মে স্বচ্ছতাও কমে যায়। এগুলো হারিয়ে গেলে নাগরিক অধিকার প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া সরকারের সিদ্ধান্ত ও নীতিমালার রেকর্ড সংরক্ষণ করে রাখায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে আদিবাসী ইতিহাস, ধর্মীয় পাণ্ডুলিপি ও স্থানীয় সংস্কৃতির তথ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকে। বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রেও সংরক্ষণাগারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো গবেষণা তথ্য ভবিষ্যতের নতুন আবিষ্কারের ভিত্তি তৈরি করে।

বর্তমান সময়ে তথ্য তৈরি হচ্ছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক দ্রুত। ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সরকারি ডাটাবেসসহ বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রতিদিন জমা হচ্ছে। কিন্তু এসব ডিজিটাল তথ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সহজ নয়। ফাইল ফরম্যাট পরিবর্তন, প্রযুক্তির অচলতা ও ডেটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নিয়মিত সংরক্ষণ, ব্যাকআপ এবং মানসম্মত পদ্ধতি ছাড়া ডিজিটাল তথ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি।
বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সংরক্ষণাগার ধ্বংস হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হারিয়ে গেছে বহুবার। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, আগুন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিও সংরক্ষিত নথির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই দিবসে সাধারণ মানুষও বিভিন্নভাবে যুক্ত হতে পারেন। স্থানীয় সংরক্ষণাগার পরিদর্শন করা, অনলাইনে ঐতিহাসিক নথি দেখা, সামাজিক মাধ্যমে তথ্য শেয়ার করা কিংবা স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া—এসবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীদের পুরোনো দলিল, ছবি বা চিঠির মাধ্যমে ইতিহাস শেখালে তাদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহও তৈরি হয়।
সংরক্ষণাগার শুধু কাগজপত্রের ভান্ডার নয়, এটি মানব ইতিহাসের জীবন্ত স্মৃতি। এই স্মৃতি যত সুরক্ষিত থাকবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তত বেশি সত্য ইতিহাস জানতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ও সচেতনতা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই পারে ইতিহাসকে সঠিকভাবে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করতে।
সুশাসন, তথ্যভাণ্ডার ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে ১৯৭২ সাল থেকে জাতীয় আরকাইভস কাজ করে আসছে। জাতীয় আরকাইভস আজ বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
ভূ-রাজনীতি, নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতি বিবেচনায় বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে নিজের স্থান করে নিয়েছে। জাতীয় আরকাইভসের সংগ্রহশালায় রক্ষিত পুরাতন নথিপত্র দেশ-বিদেশের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, গবেষকসহ সর্বস্তরের জনসাধারণের নিকট গ্রহণযোগ্য ইতিহাস চর্চার অমূল্য দলিল।
এ দিবসটি পালনের মাধ্যমে আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতর আরকাইভসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে সমর্থ হবে।’
আজকের সৃষ্ট নথিপত্রই আগামী দিনের ঐতিহাসিক দলিল তথা মূল্যবান আরকাইভাল উপকরণ বলে বিবেচিত হবে।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগার বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপাত্তসমূহ সংরক্ষণ করা হয় জাতীয় আরকাইভসে। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা, শিক্ষা ও গবেষণা, রেফারেন্স ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাতীয় আরকাইভসের গুরুত্ব অপরিসীম।