ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টেই মিললো বাবার স্বীকৃতি

মরিয়ম জাহান মুন্নি

পঞ্জিকার পাতায় দীর্ঘ ২৭টি বছর। বাবা থেকেও যেন ছিলেন না। কারণ বাবার মনে ছিলো সন্দেহ আর অবিশ্বাস ‘এই কি তার সন্তান’। তবে শেষমেষ সেই সন্দেহের অবসান গঠনো একটি ডিএনএ রিপোর্টের ভিত্তিতে। কিন্তু এক যুবকের জন্য এই দীর্ঘ সময়টা ছিল এক নিঃশব্দ কান্নার ইতিহাস। বাবার সন্দের কারণে কখনোই বাবার কাছ থেকে পেলেন না প্রকৃত স্বীকৃতি। যেকারণে প্রায় ভালোবাসা ছাড়া অনেকটা আদরে কখনো নানার বাড়ি কখনো বাবার বাড়ি উঠেছেন তিনি। একঠিন ঠিকই বাবা ঠিক অস্বিকার করেন আপন সন্তানকে। বলেন তুই আমার ছেলে না। এটি ছেলে মেনে নিতে পারেননি। দ্বারস্থ হন আইনের। চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইডে অভিযোগ করেন। সংস্থাটির মধ্যস্থতায় অবশেষে কেটেছে সেই দীর্ঘ অমাবস্যা। বিজ্ঞান ও আইনের এক মানবিক মেলবন্ধনে ঘুচেছে জন্মদাতার পরিচয় দেওয়ার আজন্ম আকুতি। জেলা লিগ্যাল এইড অফিস চট্টগ্রামের চার দেয়ালের ভেতরে রচিত হলো এক ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগার মহাকাব্য।
ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতাটা উল্টানো যাক ২৭ বছর পেছনে। তখন এই যুবকের বয়স কেবল কয়েক মাস। পৃথিবীর আলো-বাতাস চেনার আগেই তার জীবনের আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। বাবা সুদূর প্রবাসে, আর দেশে মা-বাবার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন। একপর্যায়ে তাদের স্থায়ী বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। মা যখন অন্য সংসারে চলে যান, তখন আক্ষরিক অর্থেই মাঝদরিয়ায় ভেসে যায় কয়েকমাসের এই নিষ্পাপ শিশুটি।
শৈশব থেকেই পৈতৃক স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিলো। মায়ের কোল নেই, বাবার আশ্রয় নেই এক প্রকার এতিম হয়েই মামার বাড়িতে, অন্যের দয়ায় বড় হতে থাকেন তিনি। প্রতিটি ঈদে, প্রতিটি উৎসবে যখন অন্য শিশুরা বাবার হাত ধরে নতুন জামা কিনতে যেত, এই তার চোখ তখন হয়তো আড়ালে জল ফেলত। উৎসবের আলোতেও তার চারপাশটা ছিল বড্ড অন্ধকার। মাঝে কিছু সময় বাবার বাড়ি থাকলেও বাবা তাকে মন থেকে মেনে নেয়নি। একদিন ঠিক তিনি অস্তিকার করেন তাকে। তাই নিজের অধিকার ও পিতৃপরিচয় প্রতিষ্ঠার এক অদম্য জেদ চাপে যুবকের মনে। অবহেলা আর সমাজের বাঁকা চাহনি সহ্য করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে ২০২৪ সালে তিনি সহায়হীনদের শেষ আশ্রয়স্থল চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) সুব্রত দাশের আমন্ত্রণে যখন দীর্ঘ এত বছর পর বাবা ও পুত্র মুখোমুখি হলেন, তখনো বাবার চোখে ছিল অবিশ্বাসের মেঘ, মনে ছিল সন্দেহের দেয়াল। বাবা সাফ জানিয়ে দিলেন,
“ডিএনএ টেস্টের পজিটিভ রিপোর্ট ছাড়া আমি একে সন্তান বলে স্বীকৃতি দেব না।” পিতৃত্ব প্রমাণের এই কঠিন ও ব্যয়বহুল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা ওই একাকী যুবকের পক্ষে ছিল অসম্ভব। কিন্তু তার এই শূন্য হাতে সাহস জোগায় লিগ্যাল এইড কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালে এসে লিগ্যাল এইড অফিসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও দুজন প্যানেল আইনজীবীর নিরলস লড়াইয়ের পর মা, বাবা ও সন্তানের ডিএনএ টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে যখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ডিএনএ টেস্টের চূড়ান্ত সিলমোহরযুক্ত খামটি খোলা হলো, তখন সেখানে উপস্থিত সবার নিঃশ্বাস যেন থমকে গিয়েছিল। বিজ্ঞান তার অকাট্য রায় জানিয়ে দিল—৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ জৈবিক মিল! বিজ্ঞান প্রমাণ করল, এই যুবকই ওই প্রবাসীর নিশ্চিত সন্তান।
রিপোর্টের সত্যতা প্রকাশের পর আর কোনো অজুহাত ছিল না, ছিল না কোনো অহংকার। বাবার চোখের সামনে থেকে যেন দীর্ঘ ২৭ বছরের ভুল ও সন্দেহের পর্দা এক নিমেষে সরে গেল। নিজের ভুল স্বীকার করে আর এক মুহূর্তও দেরি করেননি পিতা। পরম মমতায়, দুচোখের অশ্রু বিসর্জন দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সন্তানকে বুকে টেনে নেন।
যে বুকের ওম থেকে দীর্ঘ ২৭ বছর, সেই বুকেই মিলল জীবনের পরম শান্তি। বাবার চোখের জল আর সন্তানের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছিল লিগ্যাল এইড অফিসের বাতাস।
আপস-মীমাংসার শর্তানুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার থেকেই পুত্র তার পিতার নিজ বাসভবনের নিচতলার একটি কক্ষে বসবাস শুরু করেছেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর অবশেষে বাবার ঘরের চাবি আজ সন্তানের হাতে। টাকা-পয়সা বা সম্পত্তির চেয়েও বড় ছিল সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার, যা আজ পূর্ণতা পেয়েছে।
আগামী শুক্রবার জুমার নামাজের পর স্থানীয় মসজিদে এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে এই যুবককে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের সন্তান হিসেবে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন পিতা। একই সাথে সন্তানের যাবতীয় বৈধ উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকারও বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
এই মানবিক ও সফল মীমাংসার পর জেলা লিগ্যাল এইডের সহকারী মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলাম জানান, বিদায়বেলায় লিগ্যাল এইড অফিসের পক্ষ থেকে পিতা ও পুত্রকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে টি-শার্ট প্রদান করা হয়। অত্যন্ত আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বিনামূল্যে সরকারি আইনি সহায়তার মাধ্যমে একটি ভাঙা পরিবারের পুনর্মিলন ঘটাতে পারা এবং একজন যুবকের দীর্ঘ ২৭ বছরের পিতৃপরিচয় ফিরিয়ে দিতে পারা আমাদের আইনি সেবার অন্যতম বড় সার্থকতা। আইন শুধু শাস্তি দেয় না, আইন এভাবেও জীবনকে রাঙিয়ে দিতে পারে।”
বাবার আদর থেকে বঞ্চিত আশরাফ উদ্দিন বলেন, আমার ১০ বছর বয়সে থেকে আমি আমার বাবার বাড়িতে প্রায় পাঁচ বছর ছিলাম। কিন্তু বাবা আমাকে কখনোই মন থেকে মেনে নেননি। তিনি আমাকে আদর করতেন না বললেই চলে। পরে আমার এব ফুফুর স্বামী আমাকে গ্রীলওয়াকসপের কাজ শেখার জন্য শহরে নিয়ে আসে। এরপর আমি ২০২৪ সালে বাড়ি যেতে চাইলেই তিনি আমাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন বলেন আমি না কি তার ছেলে না। সেই তখনই আমি জেলা লিগ্যাল এইডের দ্বারস্থ হই। এর প্রেক্ষিতে আজকে এ পরিনতি। তাই বলা চলে, আমার ২৭ বছরের অন্ধকারের পর জীবনে আলো ফিরেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *