মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে সাধারণ মানুষ, ডাল-ভাতের সুরক্ষা মিলবে কি?


মরিয়ম জাহান মুন্নি

চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন হাবিবুর রহমান। পাঁচ সদস্যের পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গত তিন বছর ধরে তাঁর বেতন ২৫ হাজার টাকায় থমকে থাকলেও, চাল থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। হাবিবুর বলেন, “আগে যে মোটা চাল ৪৩-৪৫ টাকায় কিনতাম, এখন তা ৫৬ টাকা। প্রতি মাসে পরিচিত দোকান থেকে ৫-৬ হাজার টাকা বাকি খেতে হয়। বেতন পাওয়ার পর সেই ধার শোধ করি, আবার মাস শেষ হওয়ার আগেই হাত খালি। আসন্ন বাজেট নিয়ে আমরা আতঙ্কে আছি, সরকার কি আমাদের মতো ছোট মানুষের কথা ভাববে”

হাবিবুরের এই দীর্ঘশ্বাস আজ দেশের কোটি কোটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির আগ্রাসন থেকে মুক্তি পাওয়াই এখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের প্রধান চাওয়া।
বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমানে বাজারে ৫০-৫৬ টাকার নিচে কোনো মোটা চাল নেই। এক বছরের ব্যবধানে মাঝারি মানের ব্রি-২৮ চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। শাকসবজির বাজারেও নেই কোনো স্বস্তি ৭০-৮০ টাকার নিচে মিলছে না কোনো সবজি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই লাগামহীন দামের চাপে সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে।
চট্টগ্রামের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, “টানা কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকায় টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে চরমভাবে। আসন্ন বাজেটের আকার যদি গত বছরের চেয়ে অনেক বড় হয়, তবে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে, যা সরাসরি কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই মুহূর্তে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও কঠোর বাজার তদারকি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।”
অর্থনীতিবিদ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), চট্টগ্রামের সভাপতি ড. মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, “জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও রিয়াজুদ্দিন বাজারের মতো পাইকারি আড়তগুলোতে সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে কেবল বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে লাভ হবে না। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী (সোশ্যাল সেফটি নেট) আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং ওএমএস ও টিসিবির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে স্বল্পমূল্যে খাদ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।”
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের একটি শিপিং লাইনে কাজ করা আসিফ চৌধুরীর অবস্থা হাবিবুরের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। গত তিন বছরে তাঁর বেতন বেড়েছে ৬ হাজার টাকা, কিন্তু বিপরীতে জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে ১৫ হাজার টাকারও বেশি। আসিফ জানান, মাসের ১৫ তারিখের পর এখন আর পকেটে টাকা থাকে না। সঞ্চয় ভেঙে বা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে দিন পার করতে হচ্ছে।
ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসেন বলেন, “বাজেট যেন সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ না হয়। বাজেট ঘোষণা হলেই একশ্রেণীর ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। অথচ সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখা। তাই অতি নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্কসহ অন্যান্য কর না বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি। মানুষের আয় না বাড়ায় ধার-দেনা যেমন বেড়েছে, তেমনি পুষ্টিকর খাবারের তালিকা ক্রমাগত ছোট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম ভয়াবহ পুষ্টিহীনতায় ভুগবে।”
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে বাস্তবমুখী করতে সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিশেষ বিষয়ের ওপর জোর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো, খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে। ওএমএস এবং টিসিবির ট্রাক সেলের সংখ্যা বাড়ানো এবং এর মাধ্যমে পণ্য বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। করমুক্ত আয়সীমা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। আকাশচুম্বী বাজারে সাধারণ চাকরিজীবীদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো প্রয়োজন। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা দাম বাড়াচ্ছে, সেই সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন এর জন্য বাজার মনিটরিং বাড়তে হবে। উৎপাদন ব্যয় কমাতে সার ও বীজে ভর্তুকি বাড়িয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কি সাধারণ মানুষের পকেটে স্বস্তি ফেরাবে, নাকি মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াবে—সেই চিন্তায় এখন প্রহর গুনছে পুরো বাংলাদেশ। মেগা প্রজেক্ট আর বড় অঙ্কের জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়েও সাধারণ মানুষের কাছে এখন বড় চাওয়া দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকা। দেশের উন্নয়নের চাকাকে সচল রেখে সাধারণ মানুষের এই মৌলিক অধিকারটুকু নিশ্চিত করাই এখন নীতি নির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *