ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকভাড়া ঊর্ধ্বমুখী, চট্টগ্রামে বাড়ছে লোকাল ভাড়া; নিত্যপণ্যের দামে নতুন চাপের আশঙ্কা
মরিয়ম জাহান মুন্নি
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের সামগ্রিক পরিবহন খাতে। পণ্য পরিবহনে ট্রাকভাড়া ইতোমধ্যে বেড়েছে, কোথাও কোথাও চলছে দর-কষাকষি। একই সঙ্গে সরকার বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের ঘোষণা দেওয়ায় যাত্রী পরিবহনেও বাড়তি চাপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি সরকার ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রল ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)-এর দামও বেড়েছে; ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা করা হয়েছে।
পণ্য পরিবহনে বাড়তি চাপ
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট ঢাকা–চট্টগ্রামে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি সংকটের সময়ই ট্রাকভাড়া গড়ে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। আগে যেখানে ভাড়া ছিল ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা, তা বেড়ে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায় পৌঁছায়। নতুন দামের পর আবারও ভাড়া বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি অনিল চন্দ্র পাল বলেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ভাড়া কিছুটা কমতে পারে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা অনিশ্চিত।
কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে ঢাকাগামী চাল পরিবহনে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার টাকা বেড়েছে। এতে পাইকারি বাজারে চালের দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। একইভাবে বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে সবজি পরিবহনেও ট্রাকভাড়া ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা শিগগিরই কার্যকর হতে পারে।
বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ
জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়া স্বাভাবিক হলেও অযৌক্তিক ভাড়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
তিনি জানান, বিশেষ করে এসি বাসের ভাড়া দুই থেকে তিন ধাপে বাড়তে পারে। তবে সাধারণ যাত্রীদের স্বার্থে কঠোর তদারকি থাকবে, যাতে পরিবহন মালিকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারেন।
কৃত্রিম সংকট ও সরকারের অবস্থান
সরকারের মতে, দেশে জ্বালানির চাহিদা বর্তমানে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যার পেছনে অবৈধ মজুত ও পাচারের ভূমিকা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি ‘ফুয়েল পাস’ নিবন্ধন করা হয়েছে।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে এর প্রভাব সীমিতও থাকতে পারে। তার ভাষায়, “মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, না-ও বাড়তে পারে।”
মানুষের ওপর প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারদরে। ফলে চাল, সবজি থেকে শুরু করে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বাসভাড়া বৃদ্ধি পেলে নগর ও দূরপাল্লার যাত্রীদের ব্যয়ও বাড়বে।
এদিকে চট্টগ্রাম নগরীতে বাস, সিএনজি ও টেম্পুসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে ইতোমধ্যে লোকাল ভাড়া বাড়তে দেখা যাচ্ছে। যদিও সব রুটে একসঙ্গে ভাড়া বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাত্রীরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন পরিচালনার খরচ বেড়েছে। তাই ভাড়া সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। আমরা সরকারের কাছে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছি। তবে এখনো সরকারিভাবে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। এর মধ্যেই কোথাও কোথাও ভাড়া বেড়ে থাকলে তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে করা হয়েছে।”
সামগ্রিকভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন চাপ তৈরি করছে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।