দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে গণটিকাদান কর্মসূচি; দ্বিধা-শঙ্কার মাঝেও আশ্বস্ত করছেন বিশেষজ্ঞরা
মরিয়ম জাহান মুন্নি
চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার ও মো. সাইফুল ইসলামের সংসারে এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার নাম হাম। তাদের ১ বছর বয়সী দুই কন্যাশিশু আয়রা ও মাইশাকে ঘিরে আনন্দ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ের খবরে সেই আনন্দে মিশেছে অজানা ভয়।
চারদিকে হামের প্রকোপ, শিশু অসুস্থতার খবর—সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তা যেন পিছু ছাড়ছে না। যদিও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তাদের সন্তানদের আগেই হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে, তবুও নতুন করে শুরু হতে যাওয়া টিকাদান কর্মসূচি তাদের মনে তৈরি করেছে নতুন প্রশ্ন—আরেকবার টিকা দেওয়া কি প্রয়োজন? এতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে না তো?
শারমিন আক্তার বলেন, “শিশুদের সুরক্ষার জন্যই তো টিকা দেই। কিন্তু চারদিকে নানা কথা শুনে ভয় লাগে। আবার না দিলেও ভয়, দিলে যদি কোনো সমস্যা হয়—এই দোটানায় আছি।”
একই চিত্র নগরের আরও অনেক পরিবারের। বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা নাসরিন সুলতানা ও তার স্বামী রাশেদ মাহমুদের দুই সন্তানের বয়স যথাক্রমে আট মাস ও চার বছর। বড় সন্তান নিয়মিত টিকা পেলেও ছোটটির টিকা নেওয়ার সময় এখনই। কিন্তু আসন্ন ক্যাম্পেইনে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার ঘোষণায় তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
নাসরিন বলেন, “করোনার সময় টিকা নেওয়ার পর কিছু সমস্যা হয়েছিল বলে শুনেছি। তাই শিশুদের ব্যাপারে একটু বেশি সতর্ক হচ্ছি। তবে চিকিৎসকদের কথাও ভাবছি।”
অভিভাবকদের এই দ্বিধা-শঙ্কার মধ্যেই আগামী ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে এই টিকার আওতায় আনা হবে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ হাম-রুবেলার টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “বর্তমানে হামের সংক্রমণ বেড়েছে, তাই এই বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এটি বুস্টার ডোজ হিসেবে কাজ করে। আগে টিকা নেওয়া থাকলেও আবার দেওয়া যাবে, আর যারা নেয়নি তারাও নিতে পারবে।”
তিনি জানান, এই টিকা নিরাপদ এবং কার্যকর। টিকা নেওয়ার পর সামান্য জ্বর বা শরীরে লালচে ভাব দেখা দিতে পারে, যা স্বাভাবিক এবং কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়।
এদিকে অনেক অভিভাবকের উদ্বেগ টিকাকেন্দ্রে গিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে।
সাবেক জেলা সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ফজলে রাব্বী বলেন, জ্বর বা অসুস্থ শিশুদের আপাতত টিকা না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সুস্থ হওয়ার এক মাস পরই টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাই অভিভাবকদের এবিষয়ে সচেতন হতে হবে। যাতে কোনো অসুস্থ শিশুর শরীরে টিকা না দেয়া হয়। তাহলে সংক্রান্ত ছড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। এছাড়া টিকার প্রথম ডোজ ৯৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ ৯৭-৯৮ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। আবার কোনো শিশুর হাম হলেও প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে এতে শিশুর মৃত্যু ঝুঁকি থাকেনা।
প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নবজাতক শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ঝুলন দাশ শার্ম্মা বলেন,
হামে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়। দুই সপ্তাহের মধ্যে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৪–৫ দিন আলাদা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
এছাড়া তিনি বলেন, শিশুদের সুস্থ রাখতে পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি ও বিশ্রামের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক বলে জানান তিনি।
আগামী ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে উপজেলা পর্যায়ে ১০ মে পর্যন্ত এবং সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২০ মে পর্যন্ত চলবে এই টিকাদান কর্মসূচি। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য অনলাইন নিবন্ধনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, তবে নিবন্ধন ছাড়াও টিকা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
হামের বাড়তে থাকা ঝুঁকির এই সময়ে অভিভাবকদের শঙ্কা যেমন বাস্তব, তেমনি বিশেষজ্ঞদের বার্তাও স্পষ্ট। তাই ভয় নয় সচেতন হতে হবে।