হাম মোকাবিলায় টিকা মজুদ পর্যাপ্ত, কিন্তু সিরিঞ্জ সংকটে চাপে জাতীয় কর্মসূচি

নবযাত্রা প্রতিবেদন

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় আগামী ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, টিকার কোনো ঘাটতি নেই—বরং বড় পরিমাণ মজুদ রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জের স্বল্পতা কর্মসূচি বাস্তবায়নে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে প্রায় ২ কোটি ডোজ হাম-রুবেলার টিকা সংরক্ষিত আছে। কিন্তু এই টিকা ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ‘মিক্সিং সিরিঞ্জ’ রয়েছে মাত্র প্রায় ৪৫ হাজার, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ২০ লাখের মতো। ফলে টিকার মজুদ থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, হাম-রুবেলা টিকা প্রয়োগে দুটি ধরনের সিরিঞ্জ লাগে—একটি দিয়ে ভায়ালের টিকা প্রস্তুত করা হয়, অন্যটি দিয়ে শিশুকে প্রয়োগ করা হয়। প্রতিটি ভায়ালে ১০ ডোজ টিকা থাকায় বিপুল পরিমাণ টিকা ব্যবহার করতে হলে বিপুল সংখ্যক মিক্সিং সিরিঞ্জ অপরিহার্য।

ইপিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সময়মতো সিরিঞ্জ সংগ্রহ না হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তবে তারা আশা করছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কয়েক দফায় নতুন সিরিঞ্জ দেশে পৌঁছাবে।

এ বিষয়ে ইপিআইয়ের সহকারী পরিচালক ডা. হাসানুল মাহমুদ বলেন, বিদ্যমান সিরিঞ্জ দিয়েই প্রাথমিকভাবে কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে এবং টিকাদান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত নতুন সিরিঞ্জ সংগ্রহের প্রক্রিয়াও চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাস থেকে দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে দেশের অর্ধশতাধিক জেলায় এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিশুদের নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতির কারণে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হওয়াই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই দুই বছরের নিচে, এমনকি ৯ মাসের কম বয়সী শিশুও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আক্রান্ত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার টিকাদান কৌশলেও পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে ৯ ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হতো, সেখানে এখন ঝুঁকির কারণে ৬ মাস বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, টিকা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পূর্ববর্তী সময়ে ক্রয় পদ্ধতিতে জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কেন্দ্রীয় মজুদে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।

ইপিআই কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত টিকাদান কর্মসূচির জন্য দুই থেকে তিন মাসের প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে সেই সময় ছাড়াই কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে অধিক সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় টিকাদান চলছে, আর ২০ এপ্রিল থেকে গ্রাম পর্যায়েও তা বিস্তৃত হবে।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত সিরিঞ্জ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে টিকার পূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *