সাড়ে ৬ হাজার ইসলামিক বইয়ের
লাইব্রেরি জমিয়তুল ফালার
মসজিদ পাঠাগার
মরিয়ম জাহান মুন্নী
সারি সারি সাজানো নানা রঙ বেরঙ্গের ডালে বাঁধা বই। সেই বইয়ের উপর লেখা বড় ছোট অক্ষরে আরবি, বাংলা, ইংরেজি, ফারসি ও উর্দু নাম। এসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে মুসলিম শরীফ, তিরমিযি শরীফ, মেশকাত শরীফ, আবু দাউদ, লুগাতুল কুরআন, বুখারী শরীফের বিভিন্ন খ-বিশেষ। মহানবী (স.) ও সাহাবীদের জীবনীসহ ইসলামিক ও বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ৬ হাজার ৬৫৮টি বইয়ে সাজানো নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্সের নিচ তলায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ফাউ-েশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের মডেল মসজিদ পাঠাগারটি। ধর্মীয় এ পাঠাগারে এমন অনেক মূল্যবান বইয়ের সমাহার থাকলেও নেই পাঠক। ২০ বছর আগে নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্সে নিচ তলায় প্রতিষ্ঠিত হয় এ পাঠাগার। সর্বসাধারণের জন্য নির্মিত হলেও পাঠাগারটি প্রচারের অভাবে রয়ে গেছে লোক চক্ষুর আড়ালে। তবে পাঠাগার সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ জানায়, এখন সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়েছে বই এবং পাঠাগার বিমুখ। যে কারণে পাঠাগানে নেই পাঠক।
গতকাল বিকেল তিনটায় সরেজমিনে পাঠাগার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় শূন্য রয়েছে পাঠাগার। তারমধে হাতেগোনা কয়েকজন মধ্যমবয়স্ক মানুষ বসে পড়ছে বই এবং পত্রিকা। তবে চোখে পড়েছে চারজন তরুণকে। তাই বই বিমুখ হয়ে পড়লেও পাঠক যে একেবারে নেই তা বলা যাবে না। ডায়াবেটিসের রোগী দাদা শাহাদাত খানের সাথে বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছে শিশু আরিয়ান। বেশ কিছুক্ষণ জমিয়াতুল ফালার মাঠে হাটাহাটি করে দাদা নাতি। তারপরই এসেছেন মুসজিদ সংলগ্ন এ পাঠাগারে। দাদা পড়ছে একটি জাতীয় পত্রিকা আর নাতি পড়ছেন আরবি বর্ণমালার একটি বই। তারই পাশে মো. ফয়সাল করিম নামের এক তরুণ পড়ছে হাদীসের বই। কিছু দূরে মাদরাসার দুই ছাত্র খুঁজছেন নিজেদের পছন্দের বই। আরেক টেবিলে বয়স্ক এক পাঠক ব্যস্ত বইয়ের পাতা উল্টাতে। গ্রন্থাগারটিতে বইপ্রেমিদের ভিড় সেভাবে লক্ষ করা না গেলেও কিছু নিদিষ্ট পাঠক আছেন যারা প্রায় প্রতিদিনই নিয়ম করে লাইব্রেরিতে আসেন বই পড়তে।
তাদের মধ্যে মোহাম্মদ আব্বাস, মো. মহিদুল ইসলাম, পলাশ ও মো. সেলিম অন্যতম। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নিয়মিত নামাজ পড়ে সময় পেলেই লাইব্রেরিতে এসে বিভিন্ন রকম ইসলামিক বই পড়েন তারা। তবে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় একই পাঠকদের মুখ।
মোহাম্মদ শাহাদাত বলেন, জমিয়াতুল ফালার মাঠে তরুণদের উপস্থিতি বেশ ভালোই দেখা যায়। কিন্তু সে হিসেবে লাইবেরিতে পাঠকের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে ব্যতিক্রম হাতেগোনা কয়েক জন বই পড়তে আসে। আমাদের সময় ছাত্রজীবন থেকেই বই পড়ার শখ সৃষ্টি হয়। এটি নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও হত, কে কোন লেখকের কয়টা বই পড়েছে। যেকারণে এখনো বই পড়ার অভ্যাসটা আছে। তবে এখন ইসলামি বই বেশি পড়ি। অনেক কিছু জানার ইচ্ছে থেকে এখানে আসি। কারণ এখানে নানা রকমের ইসলামিক বই আছে। তবে এটি অসহনী সংকেত আমাদের তরুণরা বই বিমুখ হয়ে পড়ছে। ‘ছাত্র জীবন মানেই বই পড়ার জীবন’। কিন্তু এখন এটি হয়ে গেছে তার উল্টো। যে ছাত্র যত মেধাবী সে ততই মোবাইল ইন্টারনেটে পটু। এটি এক দিকে ভালো হলেও অন্য অনেক দিকে খুবই খারাপ। মোবাইল আসক্তির কারণে বই বিমুখ হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা।
মো. সেলিম বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তৈরিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জোর দিতে হবে। পারিবারিকভাবে সন্তানদের বই পড়ার উপর জোর দিতে হবে। শিশুদের মুখ ফোটার আগে তারা মোবাইল চিনে যায়। অভিভাবকরাও সন্তানদের মোবাইল দিয়ে ভুলানোর চেষ্টা করেন। এটি না করে ছোট থেকেই নানারকম কালারফুল বই পড়ার উপর জোর দিতে পারে। বই পড়ার উপর বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারে। সেখানে শিশুদের পছন্দের পুরষ্কার হাতে তুলে দিতে পারে। তাহলে আশা করা যায় একটি নতুন প্রজন্ম বই পড়ার দিয়ে এগিয়ে যাবে।
মো. নাছির মিয়া নামের আরেক পাঠক বলেন, এখানে একটি লাইব্রেরি আছে এটি অনেকেই জানে না। যদি প্রচার প্রচারণা হয় তবে পাঠক বাড়বে বলে আমি মনে করি।
উল্লেখ্য লাইব্রেরিটি ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে রয়েছে ইসলাম ধর্ম সংক্রান্ত বই, সাধারণ জ্ঞান ও কম্পিউটার সাইন্স, দর্শন ও মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত বই, ইসলামী বিশ্বকোষের বিভিন্ন খ-, কোরআন তাফসীনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পুস্তক, হারাম হালালের বিধান সংক্রান্ত বই, দোয়া ও মোনাজাত সংক্রান্ত বই, নামাজ রোজা হজ্জ যাকাত ও ঈমান সংক্রান্ত বই, ইতিহাস ও ভ’গোল, সাহিত্য, প্রযুক্তি বিদ্যা, বিজ্ঞান, ভাষা, সমাজ বিজ্ঞান, আইন বিজ্ঞান/ইলমে ফিকহ ও বিভিন্ন রকম হাদীস শরীফের বই।
লাইব্রেরীয়ান শাহীন বুলবুল ফেরদৌসী বলেন, এখানে ৬ হাজার ৬৫৮টি বইয়ের মধ্যে উর্দু ফারসি বই আছে প্রায় ২ হাজার। প্রতিদিনই কম বেশি পাঠক আসে। তবে নতুন পাঠকের মুখ দেখা যায় কম। লাইব্রেরিটি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সব শ্রেণীর মানুষের জন্য খোলা থাকে। এটি সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।