নবযাত্রা প্রতিবেদক
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া এই মানবিক সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার সকালে চিটাগাং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) ও ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর যৌথ উদ্যোগে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত পরিবার ও শিশুরা’ শীর্ষক এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ চট্টগ্রাম নগরীতে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর অনেক শিশু জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে অপরাধ ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো সামাজিক সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। তিনি বলেন, “এই সংকটের মূল কারণ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আমরা উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারছি না। কার্যকর অ্যাডভোকেসি এবং প্রাপ্ত অর্থের স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নিজ নিজ এলাকায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে বড় শহরগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে। “চট্টগ্রামে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বসবাস করছে। এই নগরীর পক্ষে আরও ১০ লাখ মানুষের অতিরিক্ত চাপ বহন করা সম্ভব নয়,”—বলেন মেয়র।
পরিকল্পিত নগরায়নের ক্ষেত্রে নগর সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নগরীর দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় হচ্ছে না। সমন্বিত নগর সরকার ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইপসার প্রধান নির্বাহী মো. আরিফুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সামছুদ্দিন ইলিয়াসের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি দপ্তর, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইপসার হেড অব অ্যাডভোকেসি মুহাম্মদ আলী শাহীন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ জলবায়ু দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শীর্ষ দশটি দেশের একটি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর প্রায় সাত লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এসব পরিবার শহরমুখী হয়ে অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যুক্ত হচ্ছে, যেখানে শিশু শ্রম আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মো. শামসুদ্দোহা বলেন, বিদ্যমান জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনাগুলোতে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়টি যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। তিনি জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলা এবং শিশু-কেন্দ্রিক অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেন।
অন্যান্য বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিল্পখাতের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিলের কার্যকর ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব।