নবযাত্রা ডেস্ক
বাংলা নববর্ষ এলেই বাঙালির মনে ভেসে ওঠে পান্তাভাত আর ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ। একসময় পহেলা বৈশাখের সকাল মানেই ছিল খুব সাধারণ অথচ আবেগঘন এক আয়োজন পান্তা, কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ আর সঙ্গে সোনালি রঙের ইলিশ ভাজা। কিন্তু সময় বদলেছে, সেই পরিচিত দৃশ্য এখন অনেকটাই ম্লান।
আগের দিনে গ্রামবাংলায় বৈশাখের প্রথম প্রহর শুরু হতো মাটির হাঁড়িতে ভেজানো ভাত দিয়ে। পরিবারের সবাই মিলে বসে খাওয়া, পাশে ধোঁয়া ওঠা ইলিশ এই সহজ আনন্দই ছিল উৎসবের মূল সৌন্দর্য। শুধু পরিবারেই নয়, প্রতিবেশী আর স্বজনদের নিয়ে দলবেঁধে পান্তা-ইলিশের আয়োজন ছিল সামাজিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। কোথাও কোথাও পথচারীদের মাঝেও এই খাবার বিলিয়ে দেওয়ার রীতি ছিল।
তবে এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বাজারে ইলিশের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে এই মাছ। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী এই খাবার আয়োজনে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ইলিশের বদলে অন্য মাছ ব্যবহার করছেন, আবার কেউ শুধু পান্তা, পেঁয়াজ আর মরিচেই সীমাবদ্ধ থাকছেন।
নগরজীবনের ব্যস্ততা আর পরিবর্তিত জীবনধারাও এই পরিবর্তনের বড় কারণ। এখন পহেলা বৈশাখ অনেকের কাছে ঘরোয়া আয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে বাহিরমুখী উৎসব। নামিদামি রেস্তোরাঁয় ‘বৈশাখী মেনু’ উপভোগ, নতুন পোশাকে ঘোরাঘুরি, ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার—এসবই যেন উৎসবের নতুন চেহারা তৈরি করেছে। সেখানে পান্তাভাত থাকলেও তা আর আগের মতো সাধারণ নয় বরং হয়ে উঠেছে একটি সাজানো-গোছানো, তুলনামূলক ব্যয়বহুল খাবার।
তবুও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি ঐতিহ্য। দেশের অনেক গ্রামে এখনো পহেলা বৈশাখে পান্তাভাতের আয়োজন হয়। শহরের কিছু পরিবারও নিজেদের মতো করে এই প্রথা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ইলিশ না থাকলেও ঐতিহ্যের প্রতি টান থেকেই তারা এই খাবার টেবিলে রাখছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশের প্রাপ্যতা ও দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্য আরও সংকুচিত হতে পারে। নদী ও জলাশয় রক্ষা, জাটকা সংরক্ষণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইলিশ উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি এই মাছকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে না পারলে পান্তা-ইলিশ একসময় কেবল উচ্চবিত্তের সীমাবদ্ধ আয়োজনে পরিণত হতে পারে।