৪ বছরের পরিসংখ্যানে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৪৭.৫%

এডিআরের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের ৪
বছরে ক্ষতিপুরণবাবদ ৩৬ কোটি ৪
লাখ ৫১ হাজার টাকা আদায় করে
দেয় লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম।

মরিয়ম জাহান মুন্নী

দেড় বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় জান্নাতুল ফাহিম পলির। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য স্বামীপক্ষের নির্যাতনের স্বীকার হন তিনি। সবকিছু সহ্য করেও ১৬ মাস সংসার করেন। এরিমধ্যে গর্ভবতী হয়ে পড়েন তিনি। সন্তানসম্বভা অবস্থায়ও শরীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা কমেনি। যেকারণে গর্বেই মারা যায় সন্তান। তার চার মাসের মাথায় স্বামী সাখাওয়াত হোসেন শিমুল তাকে তালাক দিয়ে দেয়। অসহায় পলি আইনি সহায়তা পেতে যৌতুকের মামলা করেন তিনি। যে মামলা এখনো চলমান। শুধু পলিই নয়, যৌতুক ও পারিবারিক কলহের জেরে প্রতিদিন অনেক নারীই নির্যাতনে শিকার হচ্ছে, ভাঙ্গছে সংসার। যার বেশির ভাগই আড়ালে থেকে যায়। চার বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী যৌতুন, পারিবারিক কলহ, পরকীয়াসহ বিভিন্ন কারণে বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা।

চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের চার বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তারমধ্যে চার বছরে সবচেয়ে বেশি নারীর প্রতি সহিংসতার অভিযোগে মামলা হয়েছে ২০২২ সালে। এসময় এক হাজার ৬২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আইনি পরামর্শও গ্রহণ করেন ৯৩ জন নারী। ২০২৩ সালে সহিংসতার অভিযোগে মামলা হয়েছে ৮৪৫টি। এছাড়া আইনি পরামর্শ নিয়েছেন ৪২ জন নারী। করোনার মধ্যে ২০২১ সালেও মামলা হয়েছে ৭৫০টি এবং আইনি পরামর্শ নেন ৪৪ জন নারী। চার বছর আগে ২০২০ সালে সহিংসতার অভিযোগে মামলা করেন ৭২০ জন নারী এবং আইনি পরামর্শ নিয়েছে ৪০ জন।

জান্নাতুল ফাহিম পলি জানান, প্রায় দেড় বছরের সংসার আমার। কিন্তু আমি আমার শ্বশুরবাড়ি নিয়ে একটা দিনের জন্য ভালো সময় কাটিয়েছি বলতে পারবো না। আমার শ্বাশুড়ি আমাকে নিজেই পছন্দ করে বিয়ে করিয়েন নেন তাঁর ছেলের জন্য। তবে তিনি আমাকে নেয়ার পরদিনই তার ছেলেকে বলেন ‘বাবা, তুই আমার একটা মাত্র ছেলে, আমার ছেলেকে আমি সাত বিয়ে করামু’। সেদিন ভেবেছিলাম তিনি মজা করছেন। আসলে তিনি সেটাই করেছেন। আমার শ্বাশুড়ি আমাকে নানাভাবে অত্যাচার করতেন। সবমসময় খোঁটা দিতেন আমি কালো বলে। তিনি এজন্য আমাকে সহ্য করতে পারতেন না। শ্বশুর আমাকে কিছুটা পছন্দ করলেও আমার শ্বাশুড়ির জন্য তিনিও আমাকে নানাভাবে কষ্ট দিতেন। সারাদিন কাজ করেও তাদের এবং স্বামীর মন পেতাম না। তারা আমার সাথে এমন ব্যবহার করতেন মনে হত আমি ঘরের বউ না কাজের মেয়ে। আমার তিন ননদ-ননাসের মধ্যে মেঝোটা শারীরিক এবং মানসিকভাবে খুব অত্যাচার করতেন কারণ তিনি আমার শ্বশুরবাড়িতে আমাদের সাথেই থাকতেন। বড় এবং ছোট ননদ তুলনামূলক ভালো ছিলেন। তবে মানসিক অত্যাচার তারাও করতেন। মেঝো ননাসের স্বামী রাশেল মিয়া ও তার ফুফাতো ভাই সাদ্দাম হোসেন আমার স্বামীকে খারাপভাবে বুঝাতেন যেন আমার সাথে সংসার না করে। উল্লেখ- সাদ্দামের চরিত্র খারাপ থাকায় সে তার এক সন্তানের মাকে তালাক দিয়ে দেয়। সেকারণে সে আমার স্বামীকেও তার পথে পরিচালনা করেন। আমার স্বামী অন্য একজন নারীর সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে পড়েন। সেই মেয়ে তার আগের প্রেমিকা ছিল। সে-ও সবার সাথে আমাকে অত্যাচার করতেন যৌতুকের জন্য। পরে আমার শ্বাশুড়ি, সাদ্দাম ও মেঝো ননাস ও ননাসের জামাই রাশেল ও বাকি ননদরা মিলে সংসার ভাঙার জন্য স্বামীকে চাপ দেন। তার প্রেক্ষিতে আমাকে কৌশলে বাড়ি থেকে বের করে দেন তারা। পরে আমাকে কোনো কারণ ছাড়া শুধুমাত্র যৌতুক দিতে না পারাকে কেন্দ্র করে তালাক নোটিশ পাঠান।

জেলা লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি সহায়তা গ্রহণকারী আরেক নারী আয়শা ছিদ্দিকা আলো (৩০) স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির বিপক্ষে নারী নির্যাতন ও যৌতুকের অভিযোগ এনে একটি মামলা করেন।  আয়শা ছিদ্দিকা আলো বলেন, আমার স্বামী অন্য নারীতে আসক্ত। সে কোনো কাজ করে না। কিন্তু প্রায় টাকার জন্য আমাকে মারধর করে। অনেকবার আমার ভাই থেকে টাকা এনেও দিয়েছি। তাতেও মারধর বন্ধ হয়নি। টাকা শেষ হলেই আবার মারধর শুরু করে। এখন সে ঐ নারীকে বিয়ে করবে বলে আমাকে তালাক দিয়েছে। উপায় না পেয়ে আমি এখানে আসি। লিগ্যাল এইডের সহায়তায় তারা আমার কাবিননামার টাকার জন্য মামলা করে। মামলার মাধ্যমে আমি কিস্তিতে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা দেনমোহর বাবদ দেয়ার কথা হয়। এরমধ্যে অর্ধেক টাকা পেয়েছি।  মামলা বাকি টাকা কিস্তিতে দিচ্ছে।

সংস্থাটির দেয়া তথ্য অনুসানে আইনি সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ক্ষতিপুরণবাবদ ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ এক কোটি ২০ লাখ ৫৮ হাজার টাকা আদায় করে। ২০২২ সালে আদায় করা হয়েছে ৭৫ লাখ ১১ হাজার টাকা। ২০২১ সালে ৮৪ লাখ ৪১ হাজার টাকা এবং ২০২০ সালে ৮৪ লাখ ৪১ হাজার টাকা আদায় করে ক্ষতিগ্রস্তের হাতে তুলে দেয়া হয়।

জেলা লিগ্যাল এইড সহকারী মো. এরশাদুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি সহায়তার দিতে গিয়ে আমরা সবসময় খেয়াল রেখেছি যেন অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত নারী যেন সুবিচার পায়। এ জন্য মামলা অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করার চেস্টা করা হয়। গত চার বছরে সাড়ে তিন হাজার মামলার মধ্যে দুই হাজার ১৩৮ মামলার নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এছারা নারীরা কোনো অভিযোগ করলে এটা গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীরা এখনো শ্বশুরবাড়ি দ্বারা নির্যাতনে স্বীকার হচ্ছেন। আবার নারীদের আসবাবপত্র উদ্ধারের মামলাও করে তাদের সব সম্পদ উদ্ধার করা হয়। এক্ষেত্রে মেয়ে পক্ষ থেকে যদি গোসলের মগটাও দেয়া হয় তবে তাই ছেলে পক্ষ থেকে নিয়ে মেয়েকে দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার এবং সিনিয়র সহকারী জজ মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বলেন, নারীদের প্রতি সহিংসতা কমাতে সরকার নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছেন। তৃণমূল পর্যায় আইনি সহায়তা পেতে আইনগত বিষয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এরমধ্যে সভা সেমিনার, কর্মশালা/ ওয়ার্কশপ, উঠান বৈঠক, প্রাতিষ্ঠানিক গণশুনানীসহ বিভিন্ন মাসিক সভা সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া তালাকের মামলায় নারীদের দেনমোহরের টাকা অল্প সময়ের মাধ্যমে আদায়  করে দেয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *