ফুলে ফুলে বৈশাখ: মোমিন রোডে কোটি টাকার স্বপ্নে রঙিন উৎসব

পহেলা বৈশাখ ঘিরে আড়াই-তিন কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা; প্লাস্টিক ফুলের দাপটের মাঝেও কাঁচা ফুলে ফিরছে প্রাণ

মরিয়ম জাহান মুন্নী

ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে নগরীর প্রাণকেন্দ্র মোমিন রোড। খোপায় গাঁথা রঙিন ফুল, কানে-গলায় ফুলের অলংকার—তরুণীদের সাজে যেন নেমে এসেছে ফুলপরীর মায়া। পহেলা বৈশাখকে বরণ করতে এমন বর্ণিল সাজে মুখর হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম, আর সেই উৎসবের কেন্দ্রে এখন জমজমাট ফুলের বাজার।

নগরীর মোমিন রোড ও চেরাগী পাহাড় মোড় ঘিরে থাকা ফুলের দোকানগুলোতে চলছে ব্যস্ততার চরম সময়। বাতাসে ভেসে আসছে টাটকা ফুলের মিষ্টি সুবাস, আর সেই সুবাসে আকৃষ্ট হয়ে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই আছে। বিশেষ করে নারী ক্রেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। কেউ কিনছেন খোপার ফুল, কেউ বুকেট, আবার কেউবা সাজসজ্জার জন্য বিভিন্ন রঙের ফুল।

ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলা নববর্ষকে ঘিরে এবার ফুল ব্যবসায় বড় প্রত্যাশা তাদের। গত কয়েক বছর করোনা, ঈদসহ নানা কারণে ব্যবসায় ধাক্কা খেতে হয়েছে। তবে এবার সেই মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছেন তারা। মোমিন রোডস্থ ফুল ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘ফুল ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদ’ জানিয়েছে, এবারের বৈশাখে তাদের লক্ষ্যমাত্রা আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম বলেন, ২০১৯ সালের পর থেকে ফুল ব্যবসা ভালো যায়নি। কর্পোরেট অর্ডারও ছিল না বললেই চলে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি বদলেছে। বিভিন্ন পোশাক কারখানা, ব্যাংক, বীমা, রেস্টুরেন্ট ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বড় অর্ডার আসছে। ফলে ব্যবসা ভালো হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তারা।

তবে বাজারে একটি বড় পরিবর্তনও চোখে পড়ছে—কাঁচা ফুলের চেয়ে আমদানি করা প্লাস্টিকের ‘চায়না ফুল’-এর চাহিদা এখন বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্লাস্টিকের ফুল দীর্ঘস্থায়ী, দৃষ্টিনন্দন এবং তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। কর্পোরেট অফিস থেকে শুরু করে বিয়ে-সাদির অনুষ্ঠান—সবখানেই এর ব্যবহার বেড়েছে।

তারপরও বৈশাখকে কেন্দ্র করে কাঁচা ফুলের চাহিদা কম নয়। বরং সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। দেশি ফুল, বিশেষ করে যশোরের ফুল, বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আগে যেখানে একটি ফুল ১০-২৫ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা ৫০-১০০ টাকায় পৌঁছেছে। আমদানিকৃত ফুলের দামও বেড়েছে ৪০-১০০ টাকায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বড় অর্ডারের পাশাপাশি খুচরা ক্রেতার সংখ্যাও প্রায় পাঁচগুণ বেড়েছে। বৈশাখের রাতেও বিয়ে ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য চলছে অর্ডার নেওয়ার হিড়িক। দোকানগুলোর কর্মীরা যেন দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে নতুন বছরের শুরুতে মোমিন রোডের ফুল ব্যবসায় ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। ফুলের ঘ্রাণে, রঙে আর উৎসবের আবহে—চট্টগ্রামের বৈশাখ যেন এবার আরও একটু বেশি রঙিন, আরও একটু বেশি আশাবাদী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *