নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া
চট্টগ্রাম ওয়াসার শীর্ষ এমডি পদে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে একই ব্যক্তির অধীনে সংস্থাটি পরিচালনার দশক পেরিয়ে গেলেও সেবার মান বাড়েনি, শুধু বেড়েছে পানির দাম এবং বছর বছর কেবল দুর্নীতির অভিযোগ। গ্রাহকসেবার মান নিয়ে বছরের পর বছর অভিযোগ বেড়েছে, তথাকথিত সিস্টেম লস বেড়েছে, অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবৈধ আয় বেড়েছে, পকেট ভারী হয়েছে। আর এসবের বিপরীতে দফায় দফায় এমডির মেয়াদ বেড়েছে এবং পানির দামও বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী ঘাটতি মেটাতে পানির উৎপাদন বাড়েনি।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই পদে থেকে চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধার আশ্রয় নিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও মানছেন না। তিনি নিজের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনকেও চাকরি দিয়েছেন। ২০১৫ সালের ৯ মে ওয়াসার এমডি’র বেতন-ভাতা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়। মূল বেতন ধরা হয় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। গত ৪ মে ওয়াসার ৬১তম বোর্ড সভায় তিনি আবারও মূল বেতন ৪ লাখ ৫০ হাজার করার আবেদন করেন বলে জানা যায়। এছাড়া গত ১১ বছরে অন্তত ৯ বার বাড়ানো হয়েছে ওয়াসার পানির দাম। চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেলেও সুনির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে রয়েছে ধীরগতি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মদুনাঘাট পানি শোধনাগার প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ অসম্পন্ন রয়ে গেছে। এই প্রকল্পে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পায় কোরিয়ান কোম্পানি তাইয়ং ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রকল্পের কাজ শেষ হতে না হতে এই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ভাণ্ডালজুড়ি প্রকল্পের কাজ। কিন্তু সময়মতো কাজ শুরু করতে না পারায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১৫৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকার বেশি। কাজ করতে গিয়ে অনভিজ্ঞতার ফলে মাঠ পর্যায়ে স্থানীয়দের সঙ্গে নানান ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নিজে কাজ না করে অনুমোদনহীন উপ-ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করানোর প্রমাণও মিলেছে।
এমন অবস্থায় স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজও তাইয়ং ইঞ্জিনিয়ারিং এর কাছে দেওয়ার তোড়জোড় করেছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি। কাজের মান ঠিক রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী বার বার তাগিদ দিলেও তাইয়ং ইঞ্জিনিয়ারিংকে বার বার কাজ দেওয়া প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিষয়টি তদন্তেরও দাবি রাখে।
একের পর এক অনিয়ম ও বিশেষ স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রকল্প ব্যয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বাড়ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে জনভোগান্তি। চট্টগ্রাম ওয়াসার নন রেভিনিউ ওয়াটার (এনআরডব্লিউ) নামে ২৫-৩৩ শতাংশ সিস্টেম লস দেখানোর ফলে বছরের পর বছর লোকসান দিতে হচ্ছে। এতে ওয়াসা প্রতি বছর কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি নগরীর অনেক এলাকার মানুষকে পানি সরবরাহ দিতে পারছে না।
চট্টগ্রাম নগরীতে এখন ৮১ হাজারের বেশি গ্রাহকের দৈনিক পানির চাহিদা ৪২ কোটি লিটার। বর্তমানে তিনটি শোধনাগার ও বিভিন্ন গভীর নলকূপের মাধ্যমে দিনে সর্বসাকুল্যে ৩৬ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের দাবি করে আসছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এ হিসাবে কাগজে-কলমে প্রায় ৬ কোটি লিটার পানির চাহিদা মেটাতে পারছে না সংস্থাটি। আবার সংস্থাটি বলছে, আগে সিস্টেম লসের কারণে ৩৪-৩৫ শতাংশ উৎপাদিত পানির অপচয় হলেও এখন তা কমে ২৯-৩০শতাংশ অপচয় হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ওয়াসার কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মিটার রিডার যোগসাজশে এ অপচয়কে ‘সিস্টেম লস’ দেখিয়ে প্রতি মাসে কোটি টাকার পানির বিল হাতিয়ে নিচ্ছেন। ফলে বারবার আলোচনায় এলেও অদৃশ্য কারণে পানির অপচয় রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও, তা ফাইলেই বন্দি রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম ওয়াসা তালিকাভুক্ত এসব সংযোগের বাইরেও হাজারো গ্রাহককে পানি সরবরাহ করে। এতে ওয়াসার একাধিক অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মিটার রিডার জড়িত। তারা দৈনিক মোট উৎপাদিত পানির ২৯-৩০ শতাংশ সিস্টেম লস দেখিয়ে অবৈধভাবে বিক্রি করে। এতে দিনে গড়ে ১১-১২ কোটি লিটারের বেশি পানি বিক্রির টাকা অবৈধভাবে তাদের পকেটে যায়। এ ছাড়া মিটার নষ্ট দেখিয়ে দীর্ঘদিন মিটার রিডাররা লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে। সিস্টেম লসের কারণে সরকার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার গ্রাহকদের ভোগান্তির আরেক নাম ‘গড় বিল’। দুই বছর আগে থেকে ফ্ল্যাট বা পরিবারপ্রতি ন্যূনতম পানির হিসাব ধরে যেভাবে বিল আদায় করা হচ্ছে, তাতে ব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিতে হচ্ছে বলে চট্টগ্রাম ওয়াসার অনেক গ্রাহকের অভিযোগ।
আবাসিক-অনাবাসিক মিলিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসায় মোট সংযোগ সংখ্যা প্রায় ৮১ হাজার। এর মধ্যে মিটারবিহীন গ্রাহক আছেন দুই হাজার, যারা দৈনিক নূন্যতম এক ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির ব্যবহার হিসেবে বিল পরিশোধ করেন। আরও প্রায় ২১ হাজার গ্রাহকের মিটার থাকলেও তারাও ন্যূনতম ব্যবহার হিসেবে বিল দেন।
গ্রাহকরা বলছেন, পানির এই ‘গড় বিল’ আদায় শুরুর পর তাদের খরচ আগের চেয়ে তিন থেকে পাঁচগুণ বেড়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারা অনেকেই এর চেয়ে কম পানি ব্যবহার করেন। একারণে অনেক বিল বকেয়া পড়েছে বলেও তাদের দাবি।
পাইপলাইন বসানোর নামে খোঁড়াখুঁড়ি করে চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা তৈরি করা ছাড়াও ভুয়া বিল-ভাউচারে ওয়াসা কর্মচারীদের বেতনের চেয়ে বেশি ওভারটাইমের নামে হরিলুট, হাজার হাজার কোটি টাকার বড় বড় প্রকল্পে অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সর্বশেষ নিরাপদ পানি সরবরাহের শিক্ষা নিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশাল বহর উগান্ডায় পাঠিয়ে দেশব্যাপী সমালোচিত হন চট্টগ্রাম ওয়াসার এই এমডি।
চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি একেএম ফজলুল্লাহ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে ২০০১ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসায় চাকরি শেষ হওয়ার পর ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়ে ২০১১ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। এসময় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ সৃষ্টির পর তিনি এই পদে এক বছরের জন্য নিয়োগ পান। এরপর আবারও এক বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন। তারপর চার দফায় আট বছর এবং সর্বশেষ তিন বছরের জন্য নিয়োগ পান তিনি।
এদিকে ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা চট্টগ্রাম ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোতে এমডির দুর্নীতি তদন্তের দাবি জানিয়েছে। দুদকেও অভিযোগ উঠেছে ওয়াসার এমডি’র বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি একেএম ফজলুল্লাহ’র বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, আউটসোর্সিং নিয়োগের নামে বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের তদন্তের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছেন হাইকোর্ট।
এসব বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম ওয়াসার কার্যালয়ে গিয়েও এমডির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লিখনকাল: ২৩ অক্টোবর, ২০২১ ইং