মরিয়ম জাহান মুন্নী
চট্টগ্রাম মহানগরীর বহদ্দারহাটের আনজুমান আক্তার রুমি ভোটার হন ২০১৮ সালে। এরপর একটি জাতীয় নির্বাচন, জাতীয় সংসদের দুটি উপনির্বাচন ও একটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাঁর নির্বাচনী এলাকায়। কিন্তু কোনো নির্বাচনেই ভোট দেওয়ার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর।
আনজুমান আক্তারের আক্ষেপ, ‘ভোটের পরিবেশ আগের মতো নেই। আর নারী ভোটারের জন্য পরিবেশ তো একেবারেই প্রতিকূল। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা ভোটকেন্দ্র ঘিরে রাখেন। ভোটকক্ষে ঢোকা পর্যন্ত পেছন লেগে থাকে। আর গোপন কক্ষে ‘ভূত’ একটা বসে থাকে। বাটন টিপে দেয়। নিজের মতো করে ভোট দিতে পারি না। ভোটের প্রতি তাই আগ্রহ নেই।’
শুধু আনজুমান আক্তার নন। কথা হয় নগরের চকবাজার, বাকলিয়া, হালিশহর, খুলশী, চান্দগাঁও, আন্দরকিল্লা, আগ্রাবাদ এলাকার নানা শ্রেণি-পেশা ও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ৬০ নারী ভোটারের সঙ্গে। তাঁদের ৪৬ জন ভোটের পরিবেশ নারী ভোটারের অনুকূলে নেই দাবি করে ভোটের প্রতি অনাগ্রহের কথা জানান। ২০ জন ভোটার হওয়ার পর থেকে পাঁচ বছরেও ভোটকেন্দ্রে যাননি। ১৫ জন ভোটকেন্দ্রে গেলেও নিজের মতো করে ভোট দিতে পারেননি। আর ১০ জন পরিবার ও স্বজনদের চাপে ভোটকেন্দ্রে গেলেও ভোট দিয়েছেন পুরুষদের পছন্দের প্রার্থীকে।
হালিশহর এলাকার হালিমা বেগম বলেন, ‘আগে আশপাশের মহিলারা মিলে দল বেঁধে ভোট দিতে যেতাম। আনন্দ পেতাম। এখন তো ভোটের আগেই আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়, যাতে মানুষ ভোটকেন্দ্রে না যায়। ২০১৪ সালের পর থেকে আর ভোট দেওয়া হয়নি।’
নির্বাচন–বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘাত-সংঘর্ষ, মামলা-হামলা ও সহিংসতার কারণে ভোটের আগে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ভোটের প্রতি অনাস্থা, অনাগ্রহ ও অবিশ্বাসের কারণে মানুষ ভোটকেন্দ্রবিমুখ হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভীতিকর পরিস্থিতি হয়েছে নারী ভোটারদের জন্য।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী মনে করেন, ভোটকেন্দ্রগুলো এখন ভীতি ও অনাস্থার জায়গা হয়ে গেছে। শুধু নারী কেন পুরুষও জীবনের ঝুঁকি নিতে চান না। মূলত ভোটের প্রতি নারীদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। এ ছাড়া ধর্মীয় মানসিকতা, পুরুষশাষিত সমাজব্যবস্থার কারণে নারীরা অধিকার সচেতন নয়।
কমছে ভোটের হার
গত দুটি জাতীয় সংসদ (দশম ও একাদশ) এবং সিটি করপোরেশন ও দুটি উপনির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারী ভোটারের উপস্থিতি দিন দিন কমছে।
২০১৮ সালে চট্টগ্রাম-৮ আসনে ভোটার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৮৫ জন। পুরুষ দুই লাখ ৪১ হাজার ১৯৮ জন ও নারী ভোটার দুই লাখ ৩৩ হাজার ২৮৭ জন। দুই লাখ ৮২ হাজার ৩১৩ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মহাজোট প্রার্থী প্রয়াত মইনউদ্দিন খান বাদল। বিএনপি দলীয় প্রার্থী পান ৬০ হাজার ৪২৮ ভোট। ভোটের হার ৭২ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এ আসন থেকে জয়লাভ করেছিলেন জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল। তিন লাখ ৭৬ হাজার ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭৬ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোটার। বিজয়ী প্রার্থী মইনউদ্দিন খান পান এক লাখ ৫০ হাজার ৬৪৮ ভোট। যা মোট ভোটের ৫১ দশমিক ৩২ শতাংশ। বিজিত প্রার্থী বিএনপির এরশাদ উল্লাহ পান এক লাখ ৩৩ হাজার ৪৬৬ ভোট। যা ৪৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
২০২০ সালে মারা যান সংসদ সদস্য মইনউদ্দিন খান বাদল। উপনির্বাচনে ভোট পড়েছিল ২৩ শতাংশ। গত ২৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। দুই বছরের ব্যবধানে ভোট কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। অথচ এরমধ্যে ভোটার বেড়েছে ৪৪ হাজার ৪০৪ জন। নগরীর চান্দগাঁও মোলভি পুকুরপাড় আয়েশা মঞ্জু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (মহিলা ভোটকেন্দ্র) কেন্দ্রে তিন হাজার ১৯৯ ভোটের মধ্যে ভোট পড়েছে ৭৮টি। ভোটের হার দুই দশমিক ১৩ শতাংশ। মোহরা ছায়েরা খাতুন খাদেরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে (মহিলা কক্ষ) তিন হাজার ৪৪০ ভোটে ভোট দিয়েছেন ১০১ নারী ভোটার। মোহলা এলএল খান উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মহিলা কক্ষে দুই হাজার ৯২৪ ভোটের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৫৪ জন নারী।
স্থানীয় ভোটার জয়নাব খাতুন বলেন, ‘বাল্যকালে ভোটের সময় এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করত। পুরুষদের পাশাপাশি ভোট নিয়ে আগ্রহী ছিলেন মহিলারাও। নারীদের ভোট দিতে রিকশা ভাড়া করে পাঠাতেন পুরুষেরা। বড় হয়ে এভাবে উৎসবমুখরভাবে ভোট দেওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। দুঃখজনক হলেও সত্যি ভোটার হওয়ার পাঁচ বছর পরও ভোট দিতে পারিনি।’
চট্টগ্রাম নগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি বলেন, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং ভোটের আগে হানাহানি, হত্যা ও সহিংসতার কারণে নারীদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ নেই। ভোটের ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে নারীরা ভোটের প্রতি বিমুখ হয়ে পড়েছে।
গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম-১০ আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে ১১ দশমকি ৭০ শতাংশ। দক্ষিণ কাট্টলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মহিলা ভোটকেন্দ্রে (কেন্দ্র-২) ভোটার সংখ্যা ২৮০৪ জন। ভোট পড়েছে ৫৫টি। নৌকা প্রতীক ৫২টি ও আরমান আলী ১টি ও জাপা প্রার্থী দুই ভোট পড়েছে। ভোটের হার এক দশমিক ৯৬ শতাংশ। একই এলাকার ফইল্যাতলী বাজার প্রাণ হরি আমিন একাডেমির মহিলা ভোটকেন্দ্রে (কেন্দ্র-২) ভোটার সংখ্যা ২৫৪৫ জন। ভোট পড়েছে ১০২টি। ভোটের হার ৪ শতাংশ। সিলভার বেলন কিন্ডার গার্টেন এন্ড গার্লস হাই স্কুল (কিন্ডার গার্টেন ভবন) ব্লক এল মহিলা ভোটকেন্দ্রে নারী ভোটার রয়েছে দুই হাজার ৩৫৩ জন। কিন্তু ভোট দিয়েছেন মাত্র ৬৭ জন নারী। সেই এলাকার আরেকটি কেন্দ্রে নারী ভোটার রয়েছে দুই হাজার ৬৯১ জন। কিন্তু ভোট দিয়েছেন মাত্র ১০০ জন নারী। ১৫টি কেন্দ্রে ৫ শতাংশ বা তারও কম ভোট পড়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বর্তমান দেশের সব নাগরিকই ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলেছে। ২০০৮ সালের পর থেকে দেশে ভোট হয়েছে, বললে ভুল হবে। ক্ষমতাশীন দল রাতের আঁধারে ভোট নিয়ে সকালে জনগণের সাথে প্রহসন করে। এ কারণে নারী বা পুরুষ কেউই এখন ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে যায় না।’
চট্টগ্রাম-১০ আসনের ভোটার মোশের্দা বেগম (৪৬) বলেন, ‘আগে ভোটের দিন ঈদের মত মনে হত। এখন তো ভোট মানে মারামারি, হানাহানি। এমন অবস্থায় মহিলাদের জন্য ভোটের পরিবেশ মোটেই সহায়ক নয়।’
এ আসনে বিজয়ী প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন, ‘নারীরা রাজনীতি নিয়ে উৎসুখ নয়। ঘর-সংসার সামলানোর কাজেই বেশি সময় কাটান। তবে অনেক নারী এখন চাকরি, রাজনীতি ও ভোটে আগ্রহী। একেবারেই যে নির্বাচনে অংশ নেয় না, তা নয়। তবে কিছু ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে নারীদের অংশগ্রহণ কিছুটা কম।’
নির্বাচন বিশ্লেষক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘আমরা হচ্ছি, ভোটপাগল বাঙালি। কিন্তু এখন যে পরিবেশে ভোট হয়, সেখানে বাঙালি আর ভোটপাগল নেই। কারণ ভোট প্রয়োগে ভোটারের ইচ্ছের কোনো দাম নেই। বাস্তবতা হচ্ছে এখন ভোট হয় না, চলছে মনোনয়ন বাণিজ্য। মনোয়ন পেলেই তিনি নির্বাচিত। গত এক দশক ধরে ভোটের প্রতি মানুষের অনাস্থা, অনীহা, অনাগ্রহ ও অবিশ্বাসের কারণে মানুষ কেন্দ্রবিমুখ হয়ে পড়েছে। এটা গণতন্ত্র, সমাজ, দেশের জন্য অংশনিসংকেত।’
নারী ভোটারের হালচাল
নির্বাচন কমিশনের হিসাব বলছে, ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে ভোটার সংখ্যা ছিল ৪৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭১ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২১ লাখ ৮৭ হাজার ১৩৭ জন। নারী ভোটার ২২ লাখ এক হাজার ৯৩৪ জন। পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার বেশি ছিল। এরপর থেকে নারী ভোটার কমতে থাকে। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ভোটার সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ ২২ হাজার ৬৫২ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৪১০ জন। নারী ভোটার ২৪ লাখ ৫০ হাজার ২৪২ জন।
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ভোটার সংখ্যা ছিল ৫৬ লাখ ৪১ হাজার ২১৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৫৪ জন। নারী ভোটার ২৭ লাখ ২৭ হাজার ১৬৫ জন। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সম্ভাব্য ভোটার তালিকা প্রস্তুত করেছে নির্বাচন কমিশন। তাতে দেখা যায়, চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ভোটার সংখ্যা ৬৩ লাখ ৩৪ হাজার ৩২ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৩ লাখ ৭ হাজার ৬৯২ জন ও নারী ভোটার ৩০ লাখ ২৬ হাজার ৩০৫ জন।
নারীনেত্রী ও মানবাধিকারকর্মী জেসমিন সুলতারা পারু বলেন, নারীরা বিভিন্ন কারণেই তাদের রাজনৈতিক অধিকার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে না। তারমধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো- আমাদের মা-বোনেরা রাজনীতি নিয়ে খুব একটা সচেতন নন। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় নারীদের ইচ্ছের খুব একটা মূল্যায়ন হয় না। ধর্মীয় অনুশাসন ও পর্দার কারণে অনেক নারী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে না। এছাড়াও রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে নারীরা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ায় আগ্রহ হারান।
সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার মোহা. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, নির্বাচনে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই আইন। তবে নারীরা যাতে নির্বিঘে ভোট দিতে পারেন, তার জন্য আলাদা ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়।
নির্বাচন–বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ভোটাধিকার প্রয়োগে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ভোটের সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রার্থীদের নারীদের উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে ভোটে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলেই এটা সম্ভব।