অর্ধ-স্বশিক্ষিত নারীদের এগিয়ে যেতে সরকারি আর্থিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে, সহজ করতে হবে প্রাপ্তির প্রক্রিয়া

শাহিদা ফাতেমা চৌধুরী
(উপসচিব) সচিব
চট্টগ্রাম ওয়াসা

মরিয়ম জাহান মুন্নী

বৃহত্তর আঙ্গিকে বিবেচনা করলে নারীরা এখনো পিছিয়ে আছে। মূলত নারী অগ্রযাত্রা শুরুই হয়েছে অনেক দেরিতে। তবে সরকারি নির্দেশনা, আইন, নীতিমালা হয়েছে বলেই বর্তমানে নারীরা পূর্বের অন্ধকার থেকে মুক্তির পথে বেরিয়ে আসতে পেরেছে।

নারী পিছিয়ে পড়ার কারণ সবার আগে পরিবার। এখনো অনেক পরিবারের চিন্তা কন্যা সন্তান বড় হলে তাকে বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ে মানেই একটা মেয়ের ব্যক্তিগত স্বপ্নের ইতি। অর্থ-সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা আরেকটি মুখ্য কারণ। সমাজ একজন প্রাপ্তবয়স্ক কন্যা সন্তানের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় না। যে কারণে মা-বাবা কন্যা সন্তান নিয়ে অজানা আশঙ্কায় থাকেন। এদিকে সমাজে কোন অঘটন ঘটলে তার দায় চাপে নারীর উপর। সমাজ এখনো নারীকে শুধুমাত্র নারী হিসেবে দেখেন। এছাড়া পারিবারিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার, বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে তার স্বামীর অসহযোগিতা নারীদের পিছনে টেনে রাখছে।

শাহিদা ফাতেমা চৌধুরী বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, তৃণমূল পর্যায়ের নারীরা এখন স্বাবলম্বী হতে চায়। প্রান্তিক এই নারীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এক্ষেত্রে হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু পালন, সেলাই, হস্তশিল্প, রন্ধনশিল্পসহ নানান বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষণ পরবর্তীতে স্বাবলম্বী হতে ট্রেডভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের বিষয়ে সরকারি ব্যাংকগুলোকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

অতীত এবং বর্তমানের শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, পড়ালেখার পরিবেশ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে আমাদের সময় যেমন ছিল বর্তমানেও তেমনি আছে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে বর্তমানে এই পরিবেশ অনেকাংশে সমৃদ্ধ হয়েছে। বর্তমান সরকার নারী শিক্ষার অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন।

কর্মজীবী মায়ের বিষয়ে বলেন, কর্মজীবী মা হিসেবে আমি বলতে পারি সন্তান লালনপালন করে চাকরি করা খুব সহজ নয়। এতে পরিবারের সহযোগিতা খুব প্রয়োজন। তবে উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। সে ক্ষেত্রে আমার চেয়ে মা-বাবাই ছিলেন অনেক বেশি সচেতন। আমি আমার মা-বাবা ও ভাই- বোন এবং স্বামীর কাছে ঋণী। তবে মাঝে মাঝে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয় সন্তানের প্রতি হয়তো দায়িত্ব পালন করতে পারিনি চাকুরির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে। আসলে আমাদের মতো প্রত্যেক নারীর সাফল্যের আড়ালে বঞ্চিত সন্তানদের দীর্ঘশ্বাসর রয়েছে।

শাহিদা ফাতেমা চৌধুরী নারী দিবস পালনের বিষয়ে বলেন, আমরা দিবস পালনে সবসময়ই পারদর্শী। কিন্তু সেই দিবসের মূল উদ্দেশ্যের সাথে কতটা আত্মীক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছি সেটাই মূখ্য বিষয়। ঘটা করে দিবস পালন করে পর মূহুর্তে পাশের নারীটিকে অবহেলা, অপমান করা, তাকে গণপরিবহনে অপদস্থ করা, তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকানো এ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নারী দিবস পালনের কোন অর্থ নেই। নারী দিবসের প্রতিপদ্য যদি অনুভূতই না হয়, এটি যদি প্রদর্শনের বিষয় হয়, যদি চিন্তাচেতনার পরিশীলতা যুক্ত না থাকে তবে সে নারী দিবস প্রতিদিন পালন করলেও কোনো লাভ নেই। সেদিনই এটা যৌক্তিক হবে যেদিন এদেশের গণপরিবহনে আর কোন নারীকে হেনস্তা হতে হবে না, কোন মেয়েকে স্কুল-কলেজে যাওয়ার পথে ইভটিজিংয়ে শিকার হতে হবে না, বাল্যবিয়ে বলে কিছুই থাকবে না, স্বামী স্ত্রীর উপর নির্যাতন করবে না, শ্বশুরবাড়িতে যৌতুকের দাবীতে কোন নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হতে হবে না, নারী ঘর থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রের সর্বত্র নিরাপদে বিচরণ করতে পারবে।

উত্তরণের উপায়: সবার আগে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। সেজন্য দেশের জনগোষ্ঠীকে পূর্ণ শিক্ষিত করে গড়ে তোলা অপরিহার্য। নারীদের শিক্ষাক্ষেত্রে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। উচ্চশিক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি অর্ধশিক্ষিত/স্বশিক্ষিত নারীগোষ্ঠীর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি আর্থিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে এবং সহযোগিতা প্রাপ্তি প্রক্রিয়া সহজতর করে দিতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের সর্বক্ষেত্রে উৎসাহিত করতে বিশেষ অনুদানেরও ব্যবস্থা করতে হবে। নারীদের বাল্যবিবাহ রোধ করতে হবে। পাঠ্যসূচিতে শিক্ষিত স্বাবলম্বী নারী ও অশিক্ষিত পিছিয়ে থাকা নারী জীবনের তুলনামূলক চিত্র সম্বলিত গল্প/উপন্যাস/প্রবন্ধ অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় সম্পৃক্ত করতে হবে। অসহায় নিপীড়িত নারীকে আইনের সুফল প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *