মরিয়ম জাহান মুন্নি
সকালে স্কুলে যাওয়ার তাড়া নেই। ইউনিফর্ম পরার ঝামেলাও নেই। মোবাইল বা টিভির সামনে বসেই ক্লাস শোনাটা স্বস্তির মনে হলেও বাস্তবে এই ‘অনলাইন ক্লাস’ এখন অনেক পরিবারের জন্য নতুন এক দুশ্চিন্তার নাম। এমনটাই জানা যায় চট্টগ্রাম নগরের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে।
তানজিলাতুন নূর তুলি, নগরের পশ্চিম মোহড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। অনলাইনে ক্লাসের কথা শুনেই তার মন খারাপ। তার এমন মন খারাপ দেখে মা, তাহমিনা আক্তার জানতে চান, কারণ কী। এবার মেয়ে বলতে শুরু করে, “আমার স্কুলে যেতে ভালো লাগে, কারণ আমার বন্ধু নাইমা, প্রমিসহ সবার সঙ্গে পড়তে, বসতে এবং একসাথে টিফিন খেতে আমার খুব ভালো লাগে। আবার খেলাধুলা করতেও পারি। কিন্তু বাসায় তো এমন কোনো সুযোগ নেই। ম্যামরা আমাদের নাচ শিখায়, গান করায়—সব কিছু ঘরে হবে না। তাই আমি অনলাইনে ক্লাস করতে চাই না। আমি স্কুলেই যেতে চাই।”
আরেক শিক্ষার্থী রিফা আক্তার, নগরের চকবাজার কাপাসগোলা সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। সম্প্রতি টেলিভিশনের খবরে অনলাইন ক্লাস চালুর সম্ভাবনার কথা দেখার পর তারও মন খারাপ। কারণ বাবা হারানো এই মেয়েটির মা, আছিয়া খাতুন, মানুষের বাসায় কাজ করেন। মায়ের একার আয় দিয়েই চলে তাদের দুই বোনসহ তিন জনের সংসার। তাদের জীবনে নেই কোনো বিলাসিতা, তাই কোনো স্মার্টফোনও নেই। মায়ের হাতে আছে একটি সাধারণ ফোন। এদিকে সে অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষার্থী। পড়াশোনার চাপ বেশ বেশি। তাই বলা চলে, স্কুলে না গেলে তার পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হবে। সে কোনোভাবেই চাইছে না অনলাইন ক্লাস হোক, কারণ তার কাছে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই।
অনলাইন ক্লাসের কথা শুনে শুধু তুলি বা রিফা নয়, মন খারাপ করেছে নগরের একাধিক প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী। বিশেষ করে চলতি বছরে বোর্ডপরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা এর বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। তবে ভিন্নমতের কিছু শিক্ষার্থীও পাওয়া গেছে, কিন্তু সংখ্যা কম।
শিক্ষার্থীদের চেয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ যেন সীমাহীন। দু’একজন এর পক্ষে কথা বললেও বেশিরভাগ অভিভাবক বিপক্ষে মত দেন।
সম্প্রতি, দেশে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন ক্লাস চালুর ভাবনা সামনে আসতেই পুরনো প্রশ্ন আবার আলোচনায় এসেছে। এই পদ্ধতি কি সত্যিই শিক্ষার উন্নতি ঘটায়, নাকি তৈরি করে নতুন বৈষম্য? কোভিড-১৯ সময়ের অভিজ্ঞতা অনেকেরই মনে আছে। অনলাইন ক্লাসে উপস্থিতি থাকলেও শেখার গভীরতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। শ্রেণিকক্ষের প্রাণবন্ত পরিবেশ, সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশা, শিক্ষকের সরাসরি তত্ত্বাবধান এসব অনলাইনে পুরোপুরি পাওয়া যায় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী শুধু ‘ক্লাসে লগইন’ করলেও প্রকৃত শেখার প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যায়।
গ্রাম বনাম শহর:
শহরাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে কিছুটা আগ্রহ দেখালেও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পদ্ধতিটিতে বেগ পেতে হয়। দেশের অধিকাংশ মানুষের হাতে স্মার্টফোন থাকলেও ভালো মানের ইন্টারনেট নেই। তাই পড়ালেখার এই স্মার্ট পদ্ধতিটি সবার জন্য সহজলভ্য নয়।
মিরসরাই উপজেলার পশ্চিম হিঙ্গুলি ইউনিয়নের হাজী চান মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তাবাচ্ছুম তাবানুর তানিশা বলেন, “আমার মায়ের কাছে একটি স্মার্টফোন আছে। কিন্তু আমাদের এখানে নেটের খুব সমস্যা। কারো সঙ্গে ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলতে গেলে বারবার লাইন কেটে যায়। কথা বলতে হলে দূরে বাগানের দিকে যেতে হয়। করোনার সময় অনলাইনে ক্লাস করেছি, তাতে পড়াশোনার কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। এখনও অংক করাতে গেলে মামা আমাকে বকাঝকা করেন।”
অভিভাবক শামিমা আক্তার বলেন, “মেয়ে করোনার সময় অনলাইনে পড়াশোনা করেছে। এসময় সে পড়াশোনায় অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। আমি চাই না আমার মেয়ে আবার সেই দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে যাক।” একই কথা বলেন জেসমিন বেগম, নাজিম উদ্দিন ও শাহজাহানসহ আরও অনেক অভিভাবক।
ফাহাদ তালুকদার নামের এক অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলে করোনার সময় পড়াশোনায় এত খারাপ হয়েছে যে এখন একাদশ শ্রেণীতে থাকলেও সে আমাদের গ্রামের ঠিকানা লিখতেও ঠিকমতো পারেন না। ইংরেজি ও বাংলার বানানেও অনেক ভুল হয়।
শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা:
অনলাইন ক্লাস মানেই শুধু ইন্টারনেট আর ডিভাইস নয়; প্রয়োজন দক্ষতা ও অভ্যাসের। অনেক শিক্ষক এখনও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ নন। ফলে ক্লাস অনেক সময় একমুখী হয়, প্রশ্নোত্তর বা আলোচনার সুযোগ সীমিত হয়।
চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট বাদশা চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকার আবদুল হামিদ সওদাগর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মামুন বলেন, আগে আমরা মোবাইল শুধু কথা বলার জন্য ব্যবহার করতাম। এর বাইরে কিছু জানি না। অনলাইন ক্লাস পদ্ধতি আমাদের জন্য কঠিন এবং বিরক্তিকর। অনেক মেশিনারিজ ও সফটওয়্যারের প্রয়োজন হয়, যা আমরা জানি না। আমার ছোট ছেলে থেকে সহযোগিতা নিয়ে করোনার সময় ক্লাস করিয়েছি। এখন সেও দেশে নেই। এটি অত্যন্ত বিরক্তিকর ছিল আমার জন্য। মূলত স্কুল খোলা থাকবে, আমরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সময়মতো আসব এটাই নিয়ম। অন্যথায় কোনো পদ্ধতি আমরা চাই না। ছোটদের জন্য স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন। ফলে শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।
জ্বালানি সাশ্রয় বনাম বাস্তবতা:
অনলাইন ক্লাসে কম যাতায়াত মানে কম জ্বালানি খরচ। তবে বাস্তব চিত্র এত সরজ নয়। একটি শ্রেণিকক্ষে একটি বা দুটি ফ্যান, কয়েকটি লাইটেই ক্লাস চলে। কিন্তু অনলাইন ক্লাসে প্রতিটি শিক্ষার্থীর ঘরে আলাদা করে বিদ্যুৎ খরচ হয়। তাই সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ খরচ কমবে না বরং বাড়তে পারে।
শিক্ষাবিদরা বলেন, অনলাইন শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সমতা। যাদের কাছে ভালো ডিভাইস, দ্রুত ইন্টারনেট, আলাদা পড়ার পরিবেশ আছে, তারা এগিয়ে যাচ্ছে। যাদের এসব নেই, তারা পিছিয়ে পড়ছে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাসহ বৈশ্বিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ বাড়িয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। অনলাইন ক্লাস চালুর ভাবনা এলেও করোনার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে এটি কার্যকর নয়। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে। জ্বালানি সাশ্রয় জরুরি হলেও শিক্ষা খাত সংকুচিত করা সমাধান নয়। সময়সূচি পরিবর্তন, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো ও বিলাসিতা নিয়ন্ত্রণের মতো বিকল্প পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ, আর দীর্ঘমেয়াদি অনলাইন নির্ভরতা শিক্ষার মান কমায়।
সমাধান:
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনলাইন ক্লাস পুরোপুরি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই, আবার একমাত্র সমাধান ভাবাও ঠিক নয়। প্রয়োজন পরিকল্পিত ও সীমিত ব্যবহার। যেখানে প্রয়োজন সেখানে অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা। বাকি ক্ষেত্রে সশরীরে ক্লাস করা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়া ও সবার জন্য প্রযুক্তি সহজলভ্য করা