অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে শঙ্কা, রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা প্রবাসী আয়ের ওপর নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ওই অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি হারানো কিংবা দেশে ফিরে আসার ঝুঁকি বাড়তে পারে। যার ফলে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।

তবে বর্তমান বাস্তবতায় এখনো রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্ত অবস্থানেই রয়েছে। রমজান ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে গত মার্চ মাসে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা একটি রেকর্ড এবং অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ঝুঁকি বাড়বে। প্রবাসীরা কর্মহীন হলে বা নতুন শ্রমিক পাঠানো ব্যাহত হলে রেমিট্যান্সে বড় ধরনের পতন দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় তেলের দাম বাড়ছে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এটি বৈদেশিক মুদ্রার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে রিজার্ভ শক্তিশালী করা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) এসেছে ২৬ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার, যা বছর শেষে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মার্চে ঈদ উপলক্ষে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও এটি সাময়িক প্রভাব। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে মধ্যপ্রাচ্যের শিল্প ও উৎপাদন খাতে ধাক্কা লাগতে পারে, যার ফলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হবে। এতে অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন।

করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও অনুরূপ পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। সে সময় অনেক শ্রমিক দেশে ফিরে আসেন, যা পরবর্তী সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব ফেলে এবং বেকারত্ব বাড়ায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বর্তমান সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়লেও এখনো রেমিট্যান্সে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে সাধারণত রেমিট্যান্স বাড়ে, মার্চের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, সংঘাতের কারণে সাময়িক প্রভাব পড়লেও প্রবাসীদের জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বন্ধ থাকা শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর প্রচেষ্টাও চলছে, যা শিগগিরই গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের কারণে নতুন শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়া ধীর হয়ে যেতে পারে এবং কর্মরতদের আয়-ব্যয়ে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, প্রবাসীরা পরিবারকে সহায়তা করতে চেষ্টা অব্যাহত রাখেন, ফলে রেমিট্যান্স পুরোপুরি হঠাৎ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডান থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এসব দেশ থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকবে। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার কারণে এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *