ভালোবাসার তুলিতে গড়া বৈশাখ: ছয় বছর পর উৎসবে মাতবে চবি

মরিয়ম জাহান মুন্নি

মাটির সরায় রংতুলির আঁচলে ফুল, পাখি, মুখসসহ নানারকম চিত্র তুলে ধরছেন শিক্ষার্থীরা। এভাবেই গত সাতদিন ধরে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন চট্টগ্রাম চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। শুধু চবি ক্যাম্পাসেই নয়, শহরেও বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ আয়োজনে কোনো কমতি নেই। জানা যায় নগরীতে শিল্পকলা একাডেমি, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ বৃহৎ দুটি বর্ষবরণ সংগঠন।

5312

চট্টগ্রামে এবারের বর্ষবরণ যেন সম্পুর্ন নতুন এক অনুভূতি। কারণ দীর্ঘ ছয় বছরের বিরতি কাটিয়ে আবারও ফিরছে পহেলা বৈশাখের বর্ণিল আয়োজন। আর সেই প্রস্তুতিতে এখন মুখরিত চবি ক্যাম্পাসসহ পুরো চট্টগ্রাম শহর।

করোনা মহামারি, রমজান এবং চারুকলা ইনস্টিটিউটের মূল ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানের কারণে কয়েক বছর ধরে থমকে ছিল বৈশাখ উদযাপন। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে এই উৎসব যেন হয়ে উঠেছিল এক অপূর্ণতার গল্প। তবে এবার সেই বিরতি ভেঙে নতুন উদ্দীপনায় ফিরে আসছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও চারুকলা ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে।

রঙে-তুলিতে ব্যস্ত চারুকলা

সরেজমিনে দেখা যায়, চারুকলা প্রাঙ্গণে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক অন্যরকম দৃশ্য। কোথাও বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে শোভাযাত্রার কাঠামো, কোথাও মুখোশে রঙের শেষ আঁচড়। পেঁচা, পাখি, ঘোড়া—নানা প্রতীকী চরিত্র যেন ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীদের হাতে।

কেউ তৈরি করছেন বিশাল মোটিফ, কেউ ব্যস্ত আলপনা কিংবা মুরালের কাজে। দলবদ্ধভাবে কাজ করছেন শিক্ষার্থীরা, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করছেন শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীরাও। সব মিলিয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউট যেন হয়ে উঠেছে এক উৎসবের কারখানা।

শিক্ষার্থীরা জানান, এবারের শোভাযাত্রার জন্য পাঁচটি বড় মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে। হাতি, টেপা পুতুলের ঘোড়া, পায়রা, মোরগ ও দোতারা। এর মাধ্যমে তুলে ধরা হবে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের নানা দিক।

নিজের হাতে গড়া উৎসব

চারুকলার শিক্ষার্থী শারমিন পলি বলেন, ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল নতুন জামা, মেলা আর নাগরদোলার আনন্দ। এখন সেই উৎসব নিজেরাই তৈরি করছি।

গত এক সপ্তাহ ধরে দিন-রাত কাজ করছি। ক্লান্তি লাগে, কিন্তু যখন দেখি কাজটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, তখন খুব ভালো লাগে—বলছিলেন তিনি।

একই অনুভূতি শোনা গেল অন্য শিক্ষার্থীদের কণ্ঠেও। তাদের কাছে এবারের বৈশাখ শুধু উৎসব নয়, বরং দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফিরে পাওয়া আনন্দের উপলক্ষ।

দিনব্যাপী বর্ণিল আয়োজন

“এসো প্রাণের উৎসবে, জাগো নব আনন্দে”—এই প্রতিপাদ্যে পহেলা বৈশাখের দিন সকাল সাড়ে ১০টায় জিরো পয়েন্ট থেকে জারুলতলা পর্যন্ত শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল আয়োজন। এরপর থাকবে আলোচনা সভা।

দুপুর থেকে শুরু হবে বৈশাখী মঞ্চের নানা আয়োজন—ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ, বলী খেলা, কাবাডি, বউচি খেলা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও সংগীতানুষ্ঠান।

দিনজুড়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরতে থাকবে নাগরদোলা, পালকি, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি ও বায়োস্কোপ। পাশাপাশি থাকবে উদ্যোক্তা মেলা, যা যুক্ত করবে ভিন্ন মাত্রা।

ঐতিহ্য আর নতুনত্বের মেলবন্ধন

চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক তাসলিমা আকতার জানান, মূল ক্যাম্পাসে ফিরে আসার পর এটি তাদের প্রথম কেন্দ্রীয় বৈশাখ আয়োজন। শিক্ষার্থীরা গত সপ্তাহ থেকেই প্রস্তুতিতে নেমেছেন।

শোভাযাত্রায় থাকবে মুখোশ, পাখি, কাঠের ঘোড়া, ইলিশ মাছসহ নানা উপস্থাপনা। পাশাপাশি আলপনা ও মুরাল যুক্ত হওয়ায় আয়োজন পেয়েছে নতুন মাত্রা।

শিল্পী রশিদ চৌধুরী হল সংসদের ভিপি খন্দকার মাশরুর আল ফাহিম বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনের পর চারুকলা মূল ক্যাম্পাসে ফিরে এসেছে, আর ফিরে আসার পর এটিই তাদের প্রথম বৈশাখ—যা তাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

সংযমী কিন্তু টেকসই আয়োজন

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবারের আয়োজনের জন্য প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার বাজেট নির্ধারণ করেছে। তবে আলোকসজ্জায় রাখা হয়েছে সংযম। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সরকারি নির্দেশনা বিবেচনায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই আয়োজনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ। তাই দেশীয় ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়েই আয়োজন সাজানো হয়েছে। অতীতে প্রাণীর ব্যবহার থাকলেও এবার তা পরিহার করে মানবিক ও সংস্কৃতিনির্ভর আয়োজন রাখা হয়েছে।

অপেক্ষার অবসান, উৎসবের প্রত্যাবর্তন

দীর্ঘদিন পর এমন বর্ণাঢ্য আয়োজন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। ক্যাম্পাসজুড়ে এখন একটাই প্রতীক্ষা—নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর।

সব মিলিয়ে বলা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবারের বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়; এটি ফিরে পাওয়া ঐতিহ্য, নতুন করে গড়ে ওঠা স্বপ্ন এবং সম্মিলিত আনন্দের এক অনন্য প্রকাশ।
নতুন বছরের সূচনায় এই আয়োজন যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়—বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব।
জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বৈশাখ
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ঐতিহ্যবাহী ডিসি হিল প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ শিরোনামে এদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলবে বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণে।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির
এদিকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে দু’দিনের বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণের প্রস্তুতি চলছে। গত এক সপ্তাহ ধরে একাডেমির শিক্ষার্থীরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাতুড়ি-পেরেকের শব্দ আর রঙ-তুলির আঁচড়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে পুরো অঙ্গন। শিক্ষার্থীরা কেউ মাটির সরায় আঁকছেন, কেউ বাঁশ ও কাগজ দিয়ে তৈরি করছেন অতিকায় কাঠামো, কেউ ব্যস্ত ক্যানভাসে রঙের প্রলেপ দিতে।
শিক্ষার্থী তাজোয়ার বলেন, শিল্পকলায় এবারে বৃহত পরিসরে বর্ষ বরণ ও বিদায়ের আয়োজন করেছে। আমাদেরও খুব ভালো লাগছে।এ উৎসবের প্রস্তুতি নিতে।
এছাড়া আজ সোমবার বিতেল ৩টা থেকে ও আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে দু’দিনব্যাপী বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
সম্মিলিত বাংলা নববর্ষ উদযাপন পরিষদ
বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উৎসবকে বরণ করতে প্রতিবারের ন্যায় এবার উৎসবের প্রস্তুতি নিয়েছে সম্মিলিত বাংলা নববর্ষ উদযাপন পরিষদ। আজ সিআরবির শিরীষতলায় বর্ষবিদায় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুদিনের এই কর্মসূচীর শুভ উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। আগামীকাল নতুন বছরকে দিনের প্রথম প্রহরে বর্ষবরণ করবেন। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে থাকবে আলোচনা সভা, আবৃত্তি, গান, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তিসহ নানা আয়োজন। আজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিকাল ৩টায় এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ
সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ-চট্টগ্রাম এর আয়োজনে প্রতি বছর ডিসি হিলে আয়োজন করা হতো এ অনুষ্ঠান। তবে এবার তাদের স্থান বদল করতে হয়েছে। ৪৮তম আয়োজনটি ডিসি হিলের পরিবর্তে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন পরিষদের সদস্য সচিব মোহাম্মদ আলী টিটো।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পহেলা বৈশাখ উদযাপন
আগামীকাল মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ এর আয়োজন করা হয়েছে নগরীর কাজীর দেউরী ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে। সন্ধ্যা ৭টা থেকে বর্ষবরণ উপলক্ষে চলবে নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *