ছুটির দিনে অপেক্ষায় বিক্রেতারা

প্রচারপ্রচারণার অভাবে নেই দর্শনার্থী। 

বই মেলার বাইরে এলাকার মোড়ে 

কয়েকটি মাইক বসিয়ে প্রচারণা 

করলে বাড়বে দর্শনার্থী। 

মরিয়ম জাহান মুন্নী

‘পথের পাঁচালী’ বইটি উল্টেপাল্টে দেখছে মিউনিসিপাল মডেল স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর তিন শিক্ষার্থী প্রিথী নাথ, নব পাল ও উষ্ণ ঘোষ। তিন বন্ধুর তিন মাথা একসাথে ঢু মেরে আছে ঐতিহাসিক এ উপন্যাসের পাতায়। তিন জনের একজন বলে উঠে ‘এই দামটা দেখ’! দেখে আরেক বন্ধু বলছে ‘২২৫ টাকা লেখা আছে’! দাম শুনে তিনজনই কেনার আগ্রহ হারায়। তবে একটু পরে নিজেরাই নিজেদের পকেটে থাকা সব টাকা বের করে তিনজনের টাকা মিলিয়ে ১৬০ টাকা জোড়াগ করতে পারে। তাদের আগ্রহ দেখে এবার এগিয়ে আসেন বই বিক্রেতা মাহিন। তিনি তিনজনকে বাড়ি ফেরার জন্য ১০ টাকা করে ৩০ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বাকি টাকায় তাদের কাছে বইটি বিক্রি করেন। এভাবে কিশোর তিন বন্ধ বইটির মালিক হয়ে যায়। বেশ আগ্রহ নিয়ে বিক্রেতাও বইটি তুলে দেয় তাদের হাতে। সুন্দর একটি মলাটে বইটি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আবার আড্ডায় মেতে উঠে তারা। 

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে নগরীর নিউমার্কেট সিটি কর্পোরেশন মিউনিসিপাল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত বই মেলায় তিন কিশোর বন্ধুর এমন সুন্দর মুহুর্তের দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রায় দু’হাজার রকমের বই নিয়ে সেজেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী এ বই মেলা। গতকাল ছিল মেলার চতুর্থ দিন। তবে এখনো জমে উঠেনি মেলা। অংশগ্রহণকারীরা ছুটির দিনের অপেক্ষা করছেন বলে জানা যায়।

মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনীর মালিক-কর্মকর্মারা বলছেন, দর্শনার্থী কম হওয়ার কারণ প্রচারপ্রচারণা নেই বললেই চলে। কেউ জানে না এখানে মেলা হচ্ছে। অন্তত্য বই মেলার বাইরে এলাকার কয়েকটি মোড়ে যদি তিন চারটা মাইক বসিয়ে প্রচারণা করা হতো তবে দর্শনার্থী বাড়বে। এছাড়া এখানে যে মেলা হচ্ছে গাড়ি নিয়ে যদি মাইকিং করা যেত তাহলেও দর্শনার্থী আসতো। 

কাকলী প্রকাশনীর কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, আগে জিমনেসিয়াম মাঠে মেলাটি হত। ভালোই বেচাবিক্রি ছিল সেখানে। এবার যেখানে মেলাটি হচ্ছে এটি নতুন জায়গা। নতুন জায়গায় কোনো মেলা হলে সেখানে প্রচারপ্রচারণা বেশি করতে হয়। মাইকিং করতে হয়। এর কিছুই এ মেলার ক্ষেত্রে করা হয়নি। তাই বেচাবিক্রিও হচ্ছে না। বেচাবিক্রি ছাড়াও এসব মেলায় দর্শনার্থীরা ঘুরতে আসে। খুব ভীড় হয়। কিন্তু এখানে সেই দর্শনার্থীও নেই।

সরকারি প্রতিষ্ঠান শিশু একাডেমি ও গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের স্টলের দায়িত্বরতরা বলেন, সামনে পূজা, মানুষ এখন পূজা নিয়ে ব্যস্ত। তাই আরো দর্শনার্থী কম দেখা যাচ্ছে। তবে আশা করছি শুক্রবার ছুটির দিনে বেচাবিক্রি বাড়বে।  

এদিকে তিন বন্ধুর সেই আড্ডায় যোগ দিই আমিও। জানতে চাই কেন কিনেছে এ বইটি?

তাঁরা জানায়, এটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। আমরা অনেক কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। সেসব প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন বই থেকে প্রশ্ন থাকে। তেমনি এ পথের পাঁচালী বইটি থেকেও অনেক প্রশ্ন পড়ে। মেলাটি আমাদের স্কুল মাঠে। তাই প্রতিদিনই আমরা বন্ধুরা আড্ডা দিতে আসি। বই দেখি, একটু আদএকটু পড়ি। কিন্তু এখনই বইটি চোখে পড়েছে। সাথে সাথে পড়া আগ্রহ জন্মায়। তাই কিনতে মন চায়। 

তিন বন্ধু আরো বলে, বই কিনবো বলে বাসা থেকে পরিকল্পনা করে আসিনি। দেখে ভালো লাগলো তাই কিনেছি। যেকোনো একজন আগে পড়ে অন্যজনকে দিব। 

তাদের থেকে জানতে চাই, এখন শিশু-কিশোর থেকে সব বয়সীরা মোবাইলে ভিডিও গেমস, ফেসবুকসহ নানান মাধ্যমে আসক্ত। সেখানে তিন বন্ধুর বই পড়ার আগ্রহটা কেন জন্মালো।

প্রিথী নাথ বলেন, আমাদের মোবাইলই নেই। মা- বাবার মোবাইল ধরলেই মারতে আসে। তবে সুযোগ পেলে আমিও গেমস খেলি। কিন্তু সব সময় একাডেমিক বই পড়তে ভালো লাগে না। তাই আমি বিভিন্ন গল্পের বই পড়ি। সেজন্য এ মেলা থেকে দু’দিন আগে ‘বেসিক আলী’ বইয়ের একটি পর্ব কিনেছি।

নব পাল বলেন, আমিও বাবাকে নিয়ে এসে প্রথম দিনে ‘শিশু বিশ্বকোষ: চতুর্থ খ- ফ থেকে ম’ বইটি কিনেছি।  

অভিভাবক ও স্কুলের শিক্ষিকা নাছরিন সুলতানা বলেন, শিশু-কিশোরদের যেভাবে তৈরি করা হয় তারা মূলত সেই ভাবেই গড়ে উঠে। আমরা বাবা-মায়েরাই এখন বই পড়িনা। শিশু-কিশোররা কিভাবে বই পড়তে শিখবে? একারণে বই পড়ার প্রতি শিশুদের আগ্রহ জন্মাচ্ছেনা। সব মেলায় যেভাবে ক্রেতা বা দর্শনার্থী হয় ঠিক সেইভাবে বই মেলায় ক্রেতা বা দর্শনার্থী হয় না। অথচ বই মেলায় বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের বেশি নিয়ে আসা দরকার। বেশি না হোক একটি বই কিনে দিক সন্তানদের। সেই বইটায় কি পড়েছে সে নিয়ে পরে তার সাথে গল্প করা দরকার। এ নিয়ে তার সাথে আলোচনা করলে সন্তানের মধ্যে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ জন্মাবে। এভাবে তারা বইয়ের আলোয় আলোকিত হবে। মোবাইল ইন্টারনেটের খারাপ আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকবে।   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *