চৈত্রের শেষ সূর্য বিদায় নিলো: নতুন আগামীর শুরু ভোর হলেই

মরিয়ম জাহান মুন্নি

চট্টগ্রামের আকাশে আজ এক অদ্ভুত মায়া। ভোরের সোনালি আলো যখন ফুটছে তখন যেন আলো জানান দিতে চাইছে চট্টগ্রামবাসি বিদায়। তোমাদের জীবন থেকে নিয়ে গেলাম- ১৪৩২ সনকে। হ্যঁ, আজ বছরের শেষ দিন, চৈত্র সংক্রান্তি, তাই আজকের প্রতিটি মুহূর্তেই মিশে আছে বিদায়ের বিষণ্নতা আর নতুন সূর্যের অপেক্ষা।

নগরজীবনের ব্যস্ত ছন্দেও আজ এক ধরনের নীরব আবেগ কাজ করছে। দোকানপাটে চলছে শেষ মুহূর্তের গোছগাছ। পুরোনো হিসাবের খাতা বন্ধ করে নতুন বছরের হালখাতা’ খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কোথাও নতুন রঙের প্রলেপ, কোথাও সাজসজ্জা সবকিছুতেই যেন নতুনকে বরণ করার আকাঙ্ক্ষা।

গ্রাম-গঞ্জে এদিনের আবহ আরও গভীর, আরও আত্মিক। ভোরের প্রথম আলোতেই শুরু হয় ঘরদোর পরিষ্কার, মাটির দেয়ালে নতুন লেপন। উঠোন ঝাড়ু দেওয়া, গোয়ালঘর ধোয়া—সব মিলিয়ে যেন এক পবিত্র প্রস্তুতি। গৃহিণীদের ব্যস্ততা থাকে রান্নাঘরে—বিল-খাল থেকে তুলে আনা শাকসবজি, নিরামিষ নানা পদ আর ঐতিহ্যবাহী সাত রকম তিতো খাবারের আয়োজন।

লোকাচার এখনও জীবন্ত অনেক পরিবারের মাঝে। সনাতনধর্মীয় নারীরা ব্রত পালন করেন সংসারের মঙ্গল কামনায়। অনেকেই আমিষ পরিহার করে কাটান দিনটি। রান্নার তালিকায় থাকে জিয়ল মাছের ঝোল, পিঠা, পায়েস, নারকেলের নাড়ু যা শুধু খাবার নয়, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে চলা স্মৃতির স্বাদ।

এই দিনে আত্মীয়তার বন্ধনও নতুন করে জাগে। অনেক পরিবারে মেয়ের জামাইকে নিমন্ত্রণ করার রীতি আজও অটুট। নতুন পোশাকে, আন্তরিক আপ্যায়নে, হাসি-আড্ডায় কাটে দিনটি। যেন বিদায়ের মাঝেই লুকিয়ে থাকে মিলনের আনন্দ।

ধর্মীয় আচারেও দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পালন করেন স্নান, দান, ব্রত ও উপবাস। অন্য ধর্মাবলম্বীরাও নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী পালন করেন নানা আচার। সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে এক সর্বজনীন সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।

চৈত্র সংক্রান্তি মানে শুধু একটি বছরের শেষ দিন নয়। এটি সময়ের এক সেতুবন্ধন, যেখানে অতীতের স্মৃতি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন মিলেমিশে যায়।

তাই চট্টগ্রামের বাতাসে আজ একটাই প্রার্থনা ভেসে বেড়ায়“যা কিছু জীর্ণ, যা কিছু ক্লান্ত, সব মুছে যাক; নতুন সূর্যের আলোয় ভরে উঠুক আগামী দিন।”
এদিকে সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর বিভিন্ন বাজারে সনাতনধর্মাবলম্বিরা পাচক রান্নার জন্য কিনছেন নানারকমের সবজি। প্রায় সব সবজি থেকে একটু একটু করে কিনেন তারা। বাজারে বেশ ভিড় ছিলো ক্রেতাদের। এ সুযোগে সবজির দামও বাড়িয়ে নিচ্ছেন বিক্রেতারা। কিন্তু তাতেও যেন কোনো আক্ষেপ নেই এ ক্রেতাদের। কারণ একটাই আজ বছরের বিদায়। যা চায় তাতেই হোকনা একটা দিন।
এমন দৃশ্য শুধু এক বাজারেই নয় , নগরীর সব বাজারেই এমন দৃশ্য দেখা যায়। তবে বিশেষ করে চকবাজার, আন্তরকিল্লাসহ সনাতনধর্মাবলম্বীদের এলাকার কাছেপিছে অবস্থানরক বাজারগুলোতে এমন কেনাবেচার সরগম বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *